০৯:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শত কোটি টাকার সরকারি জমি আত্মসাতের চেষ্টা: নেপথ্যে জালিয়াতি ও আইনি জটিলতা

  • আপডেট সময় : ০৪:৩৭:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
  • 363

মিরপুরে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের শত কোটি টাকার সরকারি জমি আত্মসাতের চেষ্টা: নেপথ্যে জালিয়াতি ও আইনি জটিলতা

জাকির পাটোয়ারী: রাজধানীর মিরপুর সেকশন-২-এর সেনপাড়া পর্বতা মৌজায় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) মালিকানাধীন প্রায় শত কোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমি অবমুক্তির নামে আত্মসাতের এক চঞ্চল্যকর চেষ্টা চলছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি গেজেট, বাস্তব দখল এবং আদালতের ‘স্ট্যাটাস কো’ (স্থিতাবস্থা) আদেশ অমান্য করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল এই বহুমূল্যবান সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে। অভিযোগ উঠেছে মিরপুর সেকশন-২ এর সেনপাড়া পর্বতা মৌজায় সিএস ৫৪৬ নম্বর দাগের শত কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি অবমুক্ত করা নিয়ে হিসাবের জটিলতা,আইনগত জটিলতা ও চাপ প্রয়োগের মাধ‍্যমে সরকারি জমি হাতছাড়া করার অপচেষ্টার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মিরপুর সেকশন-২, ব্লক-এফ, এভিনিউ-২-এর সিএস ৫৪৬ দাগের ৫.১২ একর জমির মধ‍্যে (এল.এ কেস নং-১৩/৫৯-৬০) এর মাধ‍্যমে মোট ৫.০৩ একর জমি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় কর্তৃক হুকুমদখলসকরে তৎকালীন গৃহসংস্থান ও পুনর্বাসন দপ্তর বরাবর হস্তান্তর করা হয়। গৃহায়ন কর্তৃক উক্ত জমি সত্তরের দশকেই ব‍্যবহার সম্পন্ন হয়েছে । উক্ত দাগের অবমুক্ত দাবীকৃত জমির উপর জনগুরুত্বপূর্ণ তিনটি রাস্তা, মন্দির , সরকারী অফিস, কলেজ, এবং ১৯৭৮ সাল ও পরবর্তীতে বরাদ্দকৃত ১৩টি প্লট বিদ্যমান। গৃহায়ন ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী এবং ২০২২ সালে জেলা প্রশাসকের দেয়া তথ‍্য অনুযায়ী স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে ৫.০৩ একর জমি হুকুম দখলের মাধ‍্যমে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল এবং কোনো জমি অবমুক্ত করা হয়নি।
তবে ২০২৩-২৪ সালে আওয়ামী দোসর থাকাকালীন আওয়ামী প্রভাবের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কিছু ভুল ও অযৌক্তিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ০.৪০ একর (৪০ শতক) জমি ‘অধিগ্রহণ বহির্ভূত বা অবমুক্ত’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘ চার দশক পর হঠাৎ এই ৪০ শতক জমি অবমুক্তির গেজেট প্রকাশের পর গৃহায়ণের কর্মকর্তাদের মধ্যে বড় ধরণের সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। অনেকে ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না । সর্বশেষ ২০২৪ সালে প্রকাশিত গেজেটেও গৃহায়নের হুকুম দখলকৃত জমির পরিমান ৪.৬৩ একর উল্লেখ থাকা সত্বেও ডিসি অফিস কর্তৃক সরকারী স্বার্থ নষ্ট করে ভূল তথ‍্যের ভিত্তিতে প্রেরিত পত্রের যৌক্তিকতা যাচাই না করেই মোট জমি হতে ০.৪০ একর কম তথা ৪.২৩ একর জমি বুঝে নিতে গৃহায়ন ব‍্যস্ত হয়ে উঠেছে । এ ক্ষেত্রে গেজেটে গৃহায়নের হুকুমদখলকৃত জমির পরিমান ৪.২৩ একর হওয়া বাধ্যতামূলক।
প্রায় ৪৫ বছর পূর্বে সরকার থেকে বরাদ্দ পেয়েও ভোগদখল করতে না পেরে প্লটগুলোর মালিকদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন । এই দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতিগ্রস্ত প্লট মালিকদের তথা সরকারী স্বার্থ রক্ষায় কোন চেস্টা করা হচ্ছে না । অথচ গৃহায়নের অনেক কর্মকর্তা সরকারী হাতছাড়া করে অবৈধ দখলদারদের জমি বুঝিয়ে দিতে তৎপর।
সরকারের পক্ষ হতে রেজিস্ট্রির পর জমির মালিক বরাদ্দ গ্রহীতাগন ।চেয়ার‍ম‍্যান কোন ক্ষমতাবলে এই দলিল বা মালিকানা বাতিল করেন তা রহস‍্যজনক । অবৈধ দখলদারের সাথে গোপন কোন চুক্তিতে তিনি এসব পদক্ষেপ নিচ্ছেন তা সরকারী বিভিন্ন সংস্থা খতিয়ে দেখছে ।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই বিতর্কিত জমি নিয়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে একটি দেওয়ানি রিভিশন মামলা (নং ২৭৪৮/২০১৩) চলমান রয়েছে। ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর আদালত এই জমির ওপর একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন, যা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত এই জমির আইনি বা ভৌত অবস্থার কোনো পরিবর্তন করা যাবে না।
কিন্তু আদালতের এই স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও একটি অসাধু চক্র জমিটি অবমুক্ত করার জন্য তাড়াহুড়ো করে যৌথ জরিপ ও সীমানা নির্ধারণের চেষ্টা চালাচ্ছে, যা সরাসরি আদালত অবমাননার শামিল।
এই দাগের উপর ১৯৭৮ সালে গৃহায়ন কর্তৃক গ্রুপ প্লট (চারজনকে মিলিয়ে ১টি প্লট ) বরাদ্দ ও লীজ দলিল রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়। এর মধ‍্যে বেশ কিছু প্লটের ভূল মালিকানার তথ‍্য দিয়ে পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়াই ব‍্যাক্তি পর্যায়ে গেজেটভূক্ত প্লটের জমি অসৎ উদ্দেশ্যে হাতছাড়া করতে যাচ্ছে ।
এর মধ্যে গত ০৬ মে, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ২৯৩তম বোর্ড সভায় চেয়ারম্যান মোসাঃ ফেরদৌসী বেগমের উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে উক্ত ১৩ টি প্লটের বরাদ্দ বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেলকে নির্দেশ দেওয়া হয় যাতে বিতর্কিত ৮৯ একর ভূমি ফালু মিয়া, ছালু মিয়া ও আলী মিয়া গংদের নামে সিটি জরিপের রেকর্ড অনুযায়ী নামজারি করে দেওয়া হয়। কিন্তু গৃহায়ণের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু হোরায়রা এক প্রতিবেদনে জানান, দখলদারদের প্রদর্শিত ডিসি অফিসের নকশায় উত্তর সীমানার কিছু জমি রেখে এবং পার্শ্ববর্তী রাস্তা বাদ দিয়ে যেভাবে প্লট আকারে ৮৯ শতক জমির অবস্থান দেখানো হয়েছে, তা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ।
২০২৪ সালের জেলা প্রশাসক দপ্তরের পত্রেও সরকারি স্বার্থ রক্ষা করে এসি ল‍্যান্ডকে পত্র দিলেও গৃহায়নকে অবগত না করেই সরকারী জমি ব‍্যাক্তির নামে রেকর্ড ও নামজারি সম্পন্ন করা হয় । জালিয়াতির চুড়ান্ত পর্যায়ে যৌথ জরিপ নক্সায় অবমুক্ত দাবীকৃত জমির যে অংশে রাস্তা, মন্দির, সরকারী অফিস ও কলেজের অংশ বিদ‍্যমান সেখানে সীমানা না টেনে এই দাগে সৃস্ট প্লট সমুহের দিকে ধাবিত হয়ে সরকারী জমি অবৈধ দখলে রেখে আবাসিক জমিতে অবৈধভাবে বানিজ্যিক ব‍্যবহারকারীকে লাভবান করার চেস্টা চলছে । অবমুক্ত দাবীকৃত জমি চিহ্নিত করার বিষয়ে সরকারি স্বার্থ পুরোপুরি না বুঝেই গৃহায়ন অনৈতিকভাবে লীজ রেজিস্ট্রিকৃত প্লট সমূহ বাতিলের কাজ ত্বরান্বিত করছে। ১৯৮০ সালের গেজেটে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে গৃহায়নের জমি উক্ত দাগের দক্ষিণ দিক থেকে। কিন্ত অবমুক্ত দাবীকৃত জমির কিছু অংশ জনগুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত ( যা অবমুক্তির অযোগ্য ) হলেও সেখানকার জমি (পূর্ব দিকে) অবমুক্ত না দেখিয়ে কিছু অংশে গৃহায়নের জমি উত্তর দিকে ঠেকিয়ে দিয়েছে । যা , ১৯৮০ সালের গেজেট পরিপন্হী ও সরকারী শত কোটি টাকা হাতছাড়া করার কুটকৌশল মাত্র।
অবমুক্ত দাবীদার আওয়ামীলীগের সক্রিয় ব্যাক্তিদের পক্ষে সরকারী জমি দিয়ে দেওয়ার জোড়ালো এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ এক মন্ত্রির নাম তদবীর কারক হিসেবে উঠে এসেছে । বর্তমান সরকারের ঐ মন্ত্রীর বিভিন্ন কাজে ব্যাপক সুনাম রয়েছে । তবে গৃহায়নের জন্য ক্ষতিকর এই তদবীর বাস্তবায়নের মাধ্যমে আশির্বাদ অর্জন করে ভবিষ্যতে ব্যাক্তি পর্যায়ে উপকৃত হওয়ার আশায় এবং অবৈধ লেনদেনের কারনে সরকারী স্বার্থ নষ্টের বিষয়টি গৃহায়নের কেউ মন্ত্রীর নিকট তুলে ধরেননি। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাগন কতটুকু ম‍্যনেজ হলে অন‍্যায়ের পক্ষ নিয়ে গৃহায়নের রেজিস্ট্রি দেওয়া বরাদ্দ এখতিয়ার বহির্ভূত ভাবে বাতিলের সাহস করে ।ভবিষ্যতে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বে থেকে অবৈধ স্বার্থ হাসিল করে সরকারের আরো বড় ধরনের ক্ষতি সাধন করতে পারে । বর্তমান মন্ত্রীরা দোসরদের প্রকৃত জালিয়াতি বুঝতে পারলে কখনো এই জমি হাতছাড়া করবেন না ।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সরকারের সময় ১৯৭৮ সাল থেকে বৈধভাবে বরাদ্দপত্র , বাস্তব দখলপত্র প্রদান, সম্পূর্ণ টাকা গ্রহন করে লিজ রেজিস্ট্রি করে দেওয়া প্লট মালিকদের দাবি, তারা নিয়মিত খাজনা ও ডিউস পরিশোধ করে যাচ্ছেন। কিন্তু একটি চক্র ভুয়া ও কাল্পনিক মালিকানার তথ‍্য সরবরাহ করে জালিয়াতির মাধ্যমে মূল নথি গায়েব করে তাদের প্লটের জমি অত্নসৎের পাঁয়তারা করছে। অপরদিকে, মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে এই জমি সংক্রান্ত দেওয়ানি রিভিশন মামলা (নং ২৭৪৮/২০১৩) চলমান থাকা সত্ত্বেও স্থিতাবস্থা অমান্য করে ভূমি দস্যুরা জমিটি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এই জালিয়াতি ও অনিয়মের সাথে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ হতে সদ‍্য বদলীকৃত দুজন বোর্ড সদস‍্য সহ আরো কিছু কর্মকর্তার নাম জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় অবহেলা , সরকারী জমি আত্মসাৎে সহযোগিতা এবং আদালতের নির্দেশ অমান্য করে তিন দিনের মধ্যে বিতর্কিত ৮৯ শতক জমি মেপে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য একটি তড়িঘড়ি নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। সরকারী জমি দ্রুত হাতছাড়া করার এই প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়নে বিলম্ব করায় জাগৃকের আইন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান সহ সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে ‘কারণ দর্শানোর নোটিশ’ (শোকজ) জারি করা হয়
জবাবে কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ ৬৫ বছরের পুরোনো এল.এ কেসের নথিপত্র অত্যন্ত জটিল এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তথ্যের সাথে এর বড় অমিল রয়েছে। তাছাড়া হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকায় জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি ছাড়া এককভাবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয় বলেও জানান তারা।
অপর দিকে সরকারী এই মূল‍্যবান সম্পত্তি অবমুক্ত দাবীকারী অবৈধ দখলদারদের থেকে বুঝে নেওয়া হচ্ছে না । রহস‍্যজনকভাবে সরকারী শতকোটি টাকার জমি হাতছাডা করে প্লটের মালিকানা জালিয়াতি করে রেজিস্ট্রিকৃত প্লট বাতিল, যৌক্তিকতা যাচাই ব‍্যতিরেকে অবমুক্তকৃত ০.৪০ একর জমির স্হলে ০.৮০ একর হাতছাড়া করা এবং গেজেট অমান‍্য করে দক্ষিন দিক হতে সরকারী জমি রক্ষা না করে উত্তর দিকের কিছু অংশেও গৃহায়নকে ঠেলে দেওয়া প্রসঙ্গে এই ব্যাক্তি গৃহায়নকে যেভাবে হুকুম করছে কর্মকর্তাগন সে পথে হাঁটতে বাধ‍্য হচ্ছে।

31 October 2026

শত কোটি টাকার সরকারি জমি আত্মসাতের চেষ্টা: নেপথ্যে জালিয়াতি ও আইনি জটিলতা

Spread the love
জনপ্রিয়
গ্রামীণফোনের ৯ মাসের মুনাফায় পতন, তৃতীয় প্রান্তিকে আয় অপরিবর্তিত
গ্রামীণফোনের ৯ মাসের মুনাফায় পতন, তৃতীয় প্রান্তিকে আয় অপরিবর্তিত

এইচএসসি: সেনাবাহিনী পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাসের হার ৯৬.৫১ শতাংশ

শত কোটি টাকার সরকারি জমি আত্মসাতের চেষ্টা: নেপথ্যে জালিয়াতি ও আইনি জটিলতা

আপডেট সময় : ০৪:৩৭:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬

জাকির পাটোয়ারী: রাজধানীর মিরপুর সেকশন-২-এর সেনপাড়া পর্বতা মৌজায় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) মালিকানাধীন প্রায় শত কোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমি অবমুক্তির নামে আত্মসাতের এক চঞ্চল্যকর চেষ্টা চলছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি গেজেট, বাস্তব দখল এবং আদালতের ‘স্ট্যাটাস কো’ (স্থিতাবস্থা) আদেশ অমান্য করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল এই বহুমূল্যবান সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে। অভিযোগ উঠেছে মিরপুর সেকশন-২ এর সেনপাড়া পর্বতা মৌজায় সিএস ৫৪৬ নম্বর দাগের শত কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি অবমুক্ত করা নিয়ে হিসাবের জটিলতা,আইনগত জটিলতা ও চাপ প্রয়োগের মাধ‍্যমে সরকারি জমি হাতছাড়া করার অপচেষ্টার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মিরপুর সেকশন-২, ব্লক-এফ, এভিনিউ-২-এর সিএস ৫৪৬ দাগের ৫.১২ একর জমির মধ‍্যে (এল.এ কেস নং-১৩/৫৯-৬০) এর মাধ‍্যমে মোট ৫.০৩ একর জমি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় কর্তৃক হুকুমদখলসকরে তৎকালীন গৃহসংস্থান ও পুনর্বাসন দপ্তর বরাবর হস্তান্তর করা হয়। গৃহায়ন কর্তৃক উক্ত জমি সত্তরের দশকেই ব‍্যবহার সম্পন্ন হয়েছে । উক্ত দাগের অবমুক্ত দাবীকৃত জমির উপর জনগুরুত্বপূর্ণ তিনটি রাস্তা, মন্দির , সরকারী অফিস, কলেজ, এবং ১৯৭৮ সাল ও পরবর্তীতে বরাদ্দকৃত ১৩টি প্লট বিদ্যমান। গৃহায়ন ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী এবং ২০২২ সালে জেলা প্রশাসকের দেয়া তথ‍্য অনুযায়ী স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে ৫.০৩ একর জমি হুকুম দখলের মাধ‍্যমে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল এবং কোনো জমি অবমুক্ত করা হয়নি।
তবে ২০২৩-২৪ সালে আওয়ামী দোসর থাকাকালীন আওয়ামী প্রভাবের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কিছু ভুল ও অযৌক্তিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ০.৪০ একর (৪০ শতক) জমি ‘অধিগ্রহণ বহির্ভূত বা অবমুক্ত’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘ চার দশক পর হঠাৎ এই ৪০ শতক জমি অবমুক্তির গেজেট প্রকাশের পর গৃহায়ণের কর্মকর্তাদের মধ্যে বড় ধরণের সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। অনেকে ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না । সর্বশেষ ২০২৪ সালে প্রকাশিত গেজেটেও গৃহায়নের হুকুম দখলকৃত জমির পরিমান ৪.৬৩ একর উল্লেখ থাকা সত্বেও ডিসি অফিস কর্তৃক সরকারী স্বার্থ নষ্ট করে ভূল তথ‍্যের ভিত্তিতে প্রেরিত পত্রের যৌক্তিকতা যাচাই না করেই মোট জমি হতে ০.৪০ একর কম তথা ৪.২৩ একর জমি বুঝে নিতে গৃহায়ন ব‍্যস্ত হয়ে উঠেছে । এ ক্ষেত্রে গেজেটে গৃহায়নের হুকুমদখলকৃত জমির পরিমান ৪.২৩ একর হওয়া বাধ্যতামূলক।
প্রায় ৪৫ বছর পূর্বে সরকার থেকে বরাদ্দ পেয়েও ভোগদখল করতে না পেরে প্লটগুলোর মালিকদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন । এই দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতিগ্রস্ত প্লট মালিকদের তথা সরকারী স্বার্থ রক্ষায় কোন চেস্টা করা হচ্ছে না । অথচ গৃহায়নের অনেক কর্মকর্তা সরকারী হাতছাড়া করে অবৈধ দখলদারদের জমি বুঝিয়ে দিতে তৎপর।
সরকারের পক্ষ হতে রেজিস্ট্রির পর জমির মালিক বরাদ্দ গ্রহীতাগন ।চেয়ার‍ম‍্যান কোন ক্ষমতাবলে এই দলিল বা মালিকানা বাতিল করেন তা রহস‍্যজনক । অবৈধ দখলদারের সাথে গোপন কোন চুক্তিতে তিনি এসব পদক্ষেপ নিচ্ছেন তা সরকারী বিভিন্ন সংস্থা খতিয়ে দেখছে ।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই বিতর্কিত জমি নিয়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে একটি দেওয়ানি রিভিশন মামলা (নং ২৭৪৮/২০১৩) চলমান রয়েছে। ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর আদালত এই জমির ওপর একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন, যা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত এই জমির আইনি বা ভৌত অবস্থার কোনো পরিবর্তন করা যাবে না।
কিন্তু আদালতের এই স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও একটি অসাধু চক্র জমিটি অবমুক্ত করার জন্য তাড়াহুড়ো করে যৌথ জরিপ ও সীমানা নির্ধারণের চেষ্টা চালাচ্ছে, যা সরাসরি আদালত অবমাননার শামিল।
এই দাগের উপর ১৯৭৮ সালে গৃহায়ন কর্তৃক গ্রুপ প্লট (চারজনকে মিলিয়ে ১টি প্লট ) বরাদ্দ ও লীজ দলিল রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়। এর মধ‍্যে বেশ কিছু প্লটের ভূল মালিকানার তথ‍্য দিয়ে পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়াই ব‍্যাক্তি পর্যায়ে গেজেটভূক্ত প্লটের জমি অসৎ উদ্দেশ্যে হাতছাড়া করতে যাচ্ছে ।
এর মধ্যে গত ০৬ মে, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ২৯৩তম বোর্ড সভায় চেয়ারম্যান মোসাঃ ফেরদৌসী বেগমের উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে উক্ত ১৩ টি প্লটের বরাদ্দ বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেলকে নির্দেশ দেওয়া হয় যাতে বিতর্কিত ৮৯ একর ভূমি ফালু মিয়া, ছালু মিয়া ও আলী মিয়া গংদের নামে সিটি জরিপের রেকর্ড অনুযায়ী নামজারি করে দেওয়া হয়। কিন্তু গৃহায়ণের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু হোরায়রা এক প্রতিবেদনে জানান, দখলদারদের প্রদর্শিত ডিসি অফিসের নকশায় উত্তর সীমানার কিছু জমি রেখে এবং পার্শ্ববর্তী রাস্তা বাদ দিয়ে যেভাবে প্লট আকারে ৮৯ শতক জমির অবস্থান দেখানো হয়েছে, তা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ।
২০২৪ সালের জেলা প্রশাসক দপ্তরের পত্রেও সরকারি স্বার্থ রক্ষা করে এসি ল‍্যান্ডকে পত্র দিলেও গৃহায়নকে অবগত না করেই সরকারী জমি ব‍্যাক্তির নামে রেকর্ড ও নামজারি সম্পন্ন করা হয় । জালিয়াতির চুড়ান্ত পর্যায়ে যৌথ জরিপ নক্সায় অবমুক্ত দাবীকৃত জমির যে অংশে রাস্তা, মন্দির, সরকারী অফিস ও কলেজের অংশ বিদ‍্যমান সেখানে সীমানা না টেনে এই দাগে সৃস্ট প্লট সমুহের দিকে ধাবিত হয়ে সরকারী জমি অবৈধ দখলে রেখে আবাসিক জমিতে অবৈধভাবে বানিজ্যিক ব‍্যবহারকারীকে লাভবান করার চেস্টা চলছে । অবমুক্ত দাবীকৃত জমি চিহ্নিত করার বিষয়ে সরকারি স্বার্থ পুরোপুরি না বুঝেই গৃহায়ন অনৈতিকভাবে লীজ রেজিস্ট্রিকৃত প্লট সমূহ বাতিলের কাজ ত্বরান্বিত করছে। ১৯৮০ সালের গেজেটে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে গৃহায়নের জমি উক্ত দাগের দক্ষিণ দিক থেকে। কিন্ত অবমুক্ত দাবীকৃত জমির কিছু অংশ জনগুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত ( যা অবমুক্তির অযোগ্য ) হলেও সেখানকার জমি (পূর্ব দিকে) অবমুক্ত না দেখিয়ে কিছু অংশে গৃহায়নের জমি উত্তর দিকে ঠেকিয়ে দিয়েছে । যা , ১৯৮০ সালের গেজেট পরিপন্হী ও সরকারী শত কোটি টাকা হাতছাড়া করার কুটকৌশল মাত্র।
অবমুক্ত দাবীদার আওয়ামীলীগের সক্রিয় ব্যাক্তিদের পক্ষে সরকারী জমি দিয়ে দেওয়ার জোড়ালো এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ এক মন্ত্রির নাম তদবীর কারক হিসেবে উঠে এসেছে । বর্তমান সরকারের ঐ মন্ত্রীর বিভিন্ন কাজে ব্যাপক সুনাম রয়েছে । তবে গৃহায়নের জন্য ক্ষতিকর এই তদবীর বাস্তবায়নের মাধ্যমে আশির্বাদ অর্জন করে ভবিষ্যতে ব্যাক্তি পর্যায়ে উপকৃত হওয়ার আশায় এবং অবৈধ লেনদেনের কারনে সরকারী স্বার্থ নষ্টের বিষয়টি গৃহায়নের কেউ মন্ত্রীর নিকট তুলে ধরেননি। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাগন কতটুকু ম‍্যনেজ হলে অন‍্যায়ের পক্ষ নিয়ে গৃহায়নের রেজিস্ট্রি দেওয়া বরাদ্দ এখতিয়ার বহির্ভূত ভাবে বাতিলের সাহস করে ।ভবিষ্যতে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বে থেকে অবৈধ স্বার্থ হাসিল করে সরকারের আরো বড় ধরনের ক্ষতি সাধন করতে পারে । বর্তমান মন্ত্রীরা দোসরদের প্রকৃত জালিয়াতি বুঝতে পারলে কখনো এই জমি হাতছাড়া করবেন না ।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সরকারের সময় ১৯৭৮ সাল থেকে বৈধভাবে বরাদ্দপত্র , বাস্তব দখলপত্র প্রদান, সম্পূর্ণ টাকা গ্রহন করে লিজ রেজিস্ট্রি করে দেওয়া প্লট মালিকদের দাবি, তারা নিয়মিত খাজনা ও ডিউস পরিশোধ করে যাচ্ছেন। কিন্তু একটি চক্র ভুয়া ও কাল্পনিক মালিকানার তথ‍্য সরবরাহ করে জালিয়াতির মাধ্যমে মূল নথি গায়েব করে তাদের প্লটের জমি অত্নসৎের পাঁয়তারা করছে। অপরদিকে, মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে এই জমি সংক্রান্ত দেওয়ানি রিভিশন মামলা (নং ২৭৪৮/২০১৩) চলমান থাকা সত্ত্বেও স্থিতাবস্থা অমান্য করে ভূমি দস্যুরা জমিটি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এই জালিয়াতি ও অনিয়মের সাথে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ হতে সদ‍্য বদলীকৃত দুজন বোর্ড সদস‍্য সহ আরো কিছু কর্মকর্তার নাম জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় অবহেলা , সরকারী জমি আত্মসাৎে সহযোগিতা এবং আদালতের নির্দেশ অমান্য করে তিন দিনের মধ্যে বিতর্কিত ৮৯ শতক জমি মেপে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য একটি তড়িঘড়ি নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। সরকারী জমি দ্রুত হাতছাড়া করার এই প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়নে বিলম্ব করায় জাগৃকের আইন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান সহ সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে ‘কারণ দর্শানোর নোটিশ’ (শোকজ) জারি করা হয়
জবাবে কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ ৬৫ বছরের পুরোনো এল.এ কেসের নথিপত্র অত্যন্ত জটিল এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তথ্যের সাথে এর বড় অমিল রয়েছে। তাছাড়া হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকায় জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি ছাড়া এককভাবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয় বলেও জানান তারা।
অপর দিকে সরকারী এই মূল‍্যবান সম্পত্তি অবমুক্ত দাবীকারী অবৈধ দখলদারদের থেকে বুঝে নেওয়া হচ্ছে না । রহস‍্যজনকভাবে সরকারী শতকোটি টাকার জমি হাতছাডা করে প্লটের মালিকানা জালিয়াতি করে রেজিস্ট্রিকৃত প্লট বাতিল, যৌক্তিকতা যাচাই ব‍্যতিরেকে অবমুক্তকৃত ০.৪০ একর জমির স্হলে ০.৮০ একর হাতছাড়া করা এবং গেজেট অমান‍্য করে দক্ষিন দিক হতে সরকারী জমি রক্ষা না করে উত্তর দিকের কিছু অংশেও গৃহায়নকে ঠেলে দেওয়া প্রসঙ্গে এই ব্যাক্তি গৃহায়নকে যেভাবে হুকুম করছে কর্মকর্তাগন সে পথে হাঁটতে বাধ‍্য হচ্ছে।

31 October 2026

শত কোটি টাকার সরকারি জমি আত্মসাতের চেষ্টা: নেপথ্যে জালিয়াতি ও আইনি জটিলতা

Spread the love