মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও নাটকীয় মোড় দেখা দিয়েছে। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠী হামাস অস্ত্র ছাড়তে এবং ইসরায়েলি বাহিনী ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছে। আল-জাজিরা ও এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ও সাধারণ ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করতে হামাস নিজেদের অবস্থান শিথিল করেছে। হামাসের আলোচক গাজি হামাদ জানান, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, গাজার পুনর্গঠন এবং ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ (এনসিএজি) নামের নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কমিটির কাছে অস্ত্র হস্তান্তরের বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ বার্তায় দাবি করেছেন, তার ‘বোর্ড অব পিস’ গাজায় সব সশস্ত্র গ্রুপকে নিরস্ত করার বিষয়ে সমঝোতা নিশ্চিত করেছে, যা ফিলিস্তিনে প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন অরাজনৈতিক সরকারের পথ সুগম করবে। তবে হামাস স্পষ্ট জানিয়েছে, ইসরায়েল সেনা না সরালে এই চুক্তি কার্যকর হবে না। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, গাজায় এ পর্যন্ত ৭৩,৩৪১ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
তবে গাজায় এই ইতিবাচক অগ্রগতির আবহ তৈরি হলেও অন্যদিকে মার্কিন বাহিনী ও ইরানের সরাসরি সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার জের ধরে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানে হঠাৎ বড় ধরনের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যাতে বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) তিন সদস্যসহ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এর কড়া জবাবে আইআরজিসি একযোগে জর্ডানের আল-আজরাক এবং কুয়েতের আলী-আল-সালেম মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যাপক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, তাদের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনী এই দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে।
একই সময়ে সংঘাতের তীব্র আঁচ গিয়ে পড়েছে সৌদি আরবেও। গত পাঁচ মাস ধরে সংঘাত এড়িয়ে চললেও বিগত এক সপ্তাহে ইয়েমেনের হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী জাহাজে আক্রমণ এবং দক্ষিণ ইরাকের ইরানপন্থি মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলার মুখে পড়ে বাধ্য হয়েই যুদ্ধে নেমেছে রিয়াদ। লোহিত সাগরে হামলার জবাবে সৌদি বিমানবাহিনী ইরাক ও ইয়েমেনের নির্দিষ্ট ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে। ফলে তিন দিক থেকে বৈরী শত্রুর মুখোমুখি হয়ে অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে সৌদি আরব।
সংঘাতের এই উত্তপ্ত আবহেই কূটনৈতিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনা বাড়িয়েছেন আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি হুমকি দেন যে, গাজায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কর্তৃক তার বিরুদ্ধে জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নে ইউরোপের কোনো দেশ তাকে গ্রেপ্তার করলে, ইসরায়েলের বিশেষ সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিক আইন ভেঙে সেখানে অভিযান চালিয়ে তাকে উদ্ধার করে আনবে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ৪২ পৃষ্ঠার এক নতুন প্রতিবেদনে ভারতে উৎপাদিত সামরিক সরঞ্জাম ইসরায়েলে সরবরাহের বিষয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। সংস্থাটি জানায়, গাজায় গণহত্যা চলাকালেই ভারত থেকে আড়াই হাজারেরও বেশি চালানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, বোমার পার্টস ও ড্রোন উপাদান ইসরায়েলে রপ্তানি করা হয়েছে। সংস্থাটির মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সতর্কবার্তার তোয়াক্কা না করে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে অস্ত্র পাঠিয়ে মুনাফা লুটছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্ক করেছেন যে, সব পক্ষ দ্রুত কূটনৈতিক টেবিলে না ফিরলে এই সহিংসতা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।























