বিধান কুমার বিশ্বাস
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী এ.এস.এম. আল মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠে আসছে। শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাট উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে সরকারি নলকূপ স্থাপন প্রকল্পে অনিয়ম, উপকারভোগীদের কাছ থেকে নগদ অর্থ আদায়, সাব-কন্ট্রাক্টিং, ঠিকাদারি কার্যক্রমে জড়িত থাকা এবং শ্রমিকদের পাওনা অর্থ পরিশোধ না করার অভিযোগে একাধিকবার তদন্তের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।
দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রথমে নলকূপ স্থাপন কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত শেষে কমিটি যে প্রতিবেদন দাখিল করে, তাতে মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি গুরুতর অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধান প্রকৌশলীর ৩ নভেম্বর ২০২০ তারিখে জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী উপকারভোগীদের কাছ থেকে কোনো ধরনের নগদ অর্থ বা সহায়ক চাঁদা গ্রহণের সুযোগ ছিল না। কিন্তু তদন্তে অভিযোগ পাওয়া যায় যে, মামুনুর রশিদ ওই নির্দেশনা অমান্য করে নলকূপ সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে নগদ অর্থ গ্রহণ করেছেন। তদন্ত কমিটির মতে, এটি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
শুধু তাই নয়, তদন্ত প্রতিবেদনে অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে তার অসহযোগিতামূলক আচরণের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সহকর্মীদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল না, যা সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার পরিপন্থী।
সরকারি চাকরির আড়ালে সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের অভিযোগ
তদন্ত প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল নলকূপ প্রকল্পে সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের অভিযোগ। সরকারি কর্মচারী হিসেবে কোনো ধরনের ব্যবসা বা ঠিকাদারি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ না থাকলেও তদন্তে অভিযোগ ওঠে যে, মামুনুর রশিদ নলকূপ স্থাপন প্রকল্পে সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজ করেছেন।
নথিতে উল্লেখ রয়েছে, নলকূপ স্থাপন, পাটাতন নির্মাণ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব ছিল মূল ঠিকাদারের। কিন্তু উপকারভোগীরা তদন্ত কমিটির কাছে দাবি করেন, পাটাতন নির্মাণের জন্য তাদেরকে অফিস থেকে নগদ দুই হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এতে তদন্ত কমিটি ধারণা করে যে, প্রকল্পের কাজ সরাসরি ঠিকাদারের মাধ্যমে না হয়ে অন্য কোনো মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, এসব তথ্য থেকে সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ে জড়িত থাকার বিষয়টি প্রতীয়মান হয়, যা দুর্নীতির সামিল।
কারণ দর্শানোর নোটিশ, তবুও সন্তোষজনক জবাব নয়
তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দপ্তর মামুনুর রশিদকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করে। তাকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে অভিযোগের জবাব দিতে বলা হয়েছিল।
কিন্তু দপ্তরীয় নথি অনুযায়ী, তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব দেননি। বরং ২১ কর্মদিবস পর তার জবাব সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে পৌঁছায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জবাবের সঙ্গে অভিযোগ খণ্ডনের পক্ষে কোনো ধরনের প্রমাণপত্র বা নথি সংযুক্ত করা হয়নি।
ফলে কর্তৃপক্ষ তার ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি এবং পুনরায় ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রমাণাদিসহ জবাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
সামনে আসে নতুন অভিযোগ। প্রথম তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই নতুন করে আরও বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আসে। মো. বসির মিস্ত্রি নামে এক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগে দাবি করেন, তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে নলকূপ বোরিংয়ের কাজ করেছেন। কাজের আংশিক টাকা পেলেও এখনও তার ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা বকেয়া রয়েছে।
অভিযোগকারী জানান, মামুনুর রশিদ তাকে দিয়ে বোরিংয়ের কাজ করান। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পরও পুরো পাওনা পরিশোধ করেননি। পরে তিনি জানতে পারেন, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রকল্পের কাজের সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করে দিয়েছেন।
এরপরও তার প্রাপ্য অর্থ বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
‘ফোন ধরতেন না, টাকা চাইলে এড়িয়ে যেতেন’
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, পাওনা টাকা চাইতে গেলে মামুনুর রশিদ তার ফোন রিসিভ করতেন না। বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারী দাবি করেন, শুধু তার ক্ষেত্রেই নয়, বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকেও টিউবওয়েল দেওয়ার আশ্বাসে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, চাকরি জীবনের শুরু থেকেই তিনি নানা অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং এক পর্যায়ে সাময়িক বরখাস্তও হয়েছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো সরকারি নথি তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দ্বিতীয় দফায় তদন্ত কমিটি! নতুন অভিযোগ পাওয়ার পর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করে।
কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে মাদারীপুর জেলার সহকারী প্রকৌশলী মো. তানভীর ইসলাম ইমনকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. তারিকুল ইসলাম এবং প্রাক্কলনিক মো. গোলাম মোর্শেদ।
অফিস আদেশে কমিটিকে ২০ কর্মদিবসের মধ্যে সরেজমিন তদন্ত সম্পন্ন করে মতামতসহ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্নের মুখে মাঠপর্যায়ের তদারকি। একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বারবার অনিয়ম, দুর্নীতি, সাব-কন্ট্রাক্টিং, সরকারি আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং শ্রমিকের পাওনা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে তা শুধু বিভাগীয় অপরাধ নয়; বরং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন, আর্থিক স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার জন্যও বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মহল দ্বিতীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক, বিভাগীয় কিংবা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কি না।
এ বিষয় মুঠোফোনে এ.এস.এম. আল মামুনুর রশিদের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, টাকা লেনদেন বশির মিস্তিরির সাথে! লেনদেনের বিষয়ে আমরা বুঝবো। তার অন্য কোন বক্তব্য নেই মর্মে প্রকাশ করেন।
উল্লেখ্য, ২২ সালে তার বিরুদ্ধে ক্ষুদ্ধ হয়ে নেত্রকোনা মদন উপজেলার কর্মচারীরা তার বিরুদ্ধে অনাস্থা দেন। তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই অফিসের দুজনকে মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেন।




















