নাটকীয়তায় ঠাসা এক ম্যাচে দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও অসাধারণ এক জয় তুলে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। আটালান্টায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে মিশরকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিস করে দলের প্রাণভোমরা লিওনেল মেসি যেখানে হতাশায় ডুবেছিলেন, দ্বিতীয়ার্ধের শেষ ১১ মিনিটে (স্টপেজ সময়সহ) সেই মেসির নেতৃত্বেই ঘুরে দাঁড়ায় আলবিসেলেস্তেরা। ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিওনেল মেসি এবং এনজো ফার্নান্দেজের তিন গোলে এক অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা, যা ভেঙে চূর্ণ করে দেয় মোহাম্মদ সালাহর মিশরের ঐতিহাসিক জয়ের স্বপ্ন।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার খেলায় কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা যায়। আগের ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে জয়ের পর খেলোয়াড়দের ক্লান্তি দূর করতে কোচ স্কালোনি একাদশে নিকোলাস টাগলিয়াফিকো, লিন্দ্রো পারেদেস ও জুলিয়ান আলভারেসকে ফিরিয়ে আনলেও শুরুর ধাক্কা এড়ানো যায়নি। ম্যাচের ১৫ মিনিটে মারওয়ান আতিয়ার ক্রস থেকে ইয়াসের শক্তিশালী হেডে গোল করে মিশরকে এগিয়ে দেন। পাঁচ মিনিট পর সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা। বক্সের ভেতর টাগলিয়াফিকো ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় তারা। তবে লিওনেল মেসির দুর্বল শটটি মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন। এর ফলে বিশ্বকাপে টাইব্রেকার বাদে নেওয়া আটটি পেনাল্টির চারটিই মিস করলেন মেসি এবং এক আসরে দুটি পেনাল্টি মিস করা প্রথম ফুটবলার হিসেবে এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডের মালিক হন তিনি। এরপর ম্যাক অ্যালিস্টার ও আলভারেসের দুটি দুর্দান্ত শট ঠেকিয়ে প্রথমার্ধে মিশরের লিড ধরে রাখেন আল আহলির এই গোলরক্ষক।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ম্যাচের এক ঘণ্টার মাথায় একটি কাউন্টার অ্যাটাক থেকে মোহাম্মদ সালাহর পাস ধরে মোস্তফা জিকো এমি মার্টিনেসের ওপর দিয়ে চিপ করে বল জালে পাঠান। তবে ভিএআর (VAR)-এর বিতর্কিত হস্তক্ষেপে বিল্ড-আপের শুরুতে লিসান্দ্রো মার্তিনেসের ওপর ফাউলের অভিযোগে গোলটি বাতিল হয়। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশরের ডাগআউটে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তবে এর কিছুক্ষণ পরেই সালাহ ও হাসানের সহায়তায় আবারও গোল করে দলকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন সেই জিকো। দ্বিতীয়ার্ধের কুলিং ব্রেকের সময় দুই গোলে পিছিয়ে থাকা মেসিসহ আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের শরীরী ভাষায় পরাজয়ের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল।
কিন্তু ম্যাচের চিত্রনাট্য বদলে যায় শেষ মুহূর্তে। ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর এক দুর্দান্ত হেডে প্রথম গোল শোধ করে ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দেয় আর্জেন্টিনা। এর পরেই শুরু হয় মেসি-ম্যাজিক। ম্যাচের ৮৩ মিনিটে গনসালো মন্টিয়েলের পাস থেকে দুর্দান্ত এক হাফ-ভলিতে গোল করে আর্জেন্টিনাকে ২-২ সমতায় ফেরান অধিনায়ক। গোলরক্ষক শোবেইর বল স্পর্শ করলেও তা ক্রসবারে লেগে জালে জড়ায়। এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের ২১তম গোল করার পাশাপাশি টানা নয় ম্যাচে গোল করার বিশ্বরেকর্ড গড়েন মেসি, একই সাথে ৮ গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়েও এগিয়ে যান তিনি।
ম্যাচের নাটকীয়তার শেষ অঙ্কটি থিতু হয় স্টপেজ টাইমে। লটারো মার্তিনেসের ক্রস থেকে এনজো ফার্নান্দেজের শক্তিশালী হেড মিশরের জাল কাঁপিয়ে দিলে ৩-২ ব্যবধানের এক অবিশ্বাস্য ও ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার। ম্যাচ শেষে এই রোমাঞ্চকর জয়ের পর মাঠে মেসিকে আবেগাপ্লুত হয়ে চোখের পানি ফেলতে দেখা যায়। অন্যদিকে একাধিক বিতর্কিত রেফারিং সিদ্ধান্ত ও গোল বাতিলের কারণে ম্যাচ শেষে ক্ষোভে ফেটে পড়ে মিশর ফুটবল দল, যার জের ধরে তাদের কোচিং স্টাফের একজন সদস্যকে লাল কার্ডও দেখতে হয়।























