১০:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলে জালিয়াতির নিয়োগ

প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় ভুয়া ঠিকানায় চাকরি

  • আপডেট সময় : ১০:৫৪:৩৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
  • 248

প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় ভুয়া ঠিকানায় চাকরি

বিধান কুমার বিশ্বাস: জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) নলকূপ মেকানিক পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ অনিয়ম, তথ্য গোপন ও ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে এমন একাধিক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে জেলা কোটার বিধিনিষেধ এড়াতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে নিজ জেলার পরিচয় গোপন করে অন্য জেলার বাসিন্দা সেজে সরকারি চাকরি নিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১১ ও ২০১২ সালের নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়েও একই ধরনের কৌশলে একাধিক ব্যক্তি চাকরি লাভ করেন। সংশ্লিষ্ট সময়ে (২০০৯-২০১৪) জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন মাগুরা জেলার মো. নুরুজ্জামান। অভিযোগ অনুযায়ী, তার দায়িত্বকালেই মাগুরা জেলার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থী নিজ জেলার তথ্য গোপন করে ঢাকা জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা হিসেবে আবেদন করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রতিবন্ধী কোটা ছাড়া মাগুরা জেলার সাধারণ প্রার্থীদের জন্য জেলা কোটা ছিল না। অভিযোগ রয়েছে, এই সীমাবদ্ধতা এড়াতে প্রার্থীরা পৈতৃক নিবাস, স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানা, জন্মস্থান, এমনকি পারিবারিক পরিচয় গোপন বা পরিবর্তন করে ঢাকা জেলার বাসিন্দা হিসেবে আবেদন করেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেরই জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ, পৈতৃক ভিটা, পারিবারিক বসবাস এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অবস্থান মাগুরা জেলায় হলেও চাকরির আবেদনপত্রে ঢাকা জেলার ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে ফরিদপুর সার্কেলের অধীন রাজবাড়ী জেলার চারটি উপজেলার পাঁচজন নলকূপ মেকানিকের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তারা হলেন—
পাংশা উপজেলা: মো. আলহাজ্ব হোসেন, গোয়ালন্দ উপজেলা: মো. রেজাউল করিম ও বেগম মর্জিনা খাতুন, রাজবাড়ী সদর উপজেলা: শাহীন শিকদার, কালুখালী উপজেলা: মো. হাসিব হাসান।
স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধান, বিভিন্ন সরকারি নথি, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত তথ্য এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে সবচেয়ে আলোচিত নাম মো. হাসিব হাসান। ১৭ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি (স্মারক নং-৪৬.০৩.২৬০০.০৮১.১১.২৩৩.১৮-৬৯৪৮)-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, মাগুরাসহ কয়েকটি জেলার সাধারণ প্রার্থীরা আবেদন করতে পারবেন না। কেবল এতিম ও প্রতিবন্ধী কোটার প্রার্থীদের জন্য ব্যতিক্রম রাখা হয়েছিল।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার আমলসার ইউনিয়নের কালীনগর (কুরুন্দী) গ্রামের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও তিনি আবেদনপত্রে ঢাকা জেলার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের সুভাঢ্যা চৌধুরীপাড়া এলাকার বাসিন্দা হিসেবে তথ্য প্রদান করেন।

অনুসন্ধানে পাওয়া জন্মনিবন্ধন সনদে তার গ্রামের ঠিকানা কালীনগর, ইউনিয়ন আমলসার, উপজেলা শ্রীপুর, জেলা মাগুরা উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া তার শিক্ষাজীবনের তথ্যেও মাগুরা জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়। তার জাতীয় পরিচয় পত্রেও স্থায়ী অস্থায়ী ঠিকানা ও জন্মস্থান হিসেবে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার আমলসার ইউনিয়নের কালীনগর (কুরুন্দী) ৬ নং ওয়ার্ড উল্লেখ রয়েছে।

২২ অক্টোবর ২০১২ সালের অফিস আদেশে (স্মারক নং-১৫৪৩ জঃসাঃপ্রঃঅঃ (এফসি)) ১৩ নম্বর ক্রমিকে রোল নম্বর ২৯৩৩-এর প্রার্থী শাহীন শিকদারকে ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার ছোট বকসনগর গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তবে অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, ওই ঠিকানায় তার কোনো জমি, বসতভিটা কিংবা স্থায়ী বসবাসের ইতিহাস পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে তার জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মস্থান এবং স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা হিসেবে মাগুরা সদর উপজেলার পুকুরিয়া গ্রামের তথ্য রয়েছে বলে নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়।

একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে পাংশা উপজেলা জনস্বাস্থ্যে কর্মরত মো. আলহাজ্ব হোসেনের বিরুদ্ধে! তার জন্মস্থান মাগুরা। তিনি ২০১২ সালে ভোটার হন। তার জন্ম সনদ ও জাতীয় পরিচয় পত্রে এবং মাধ্যমিকে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার আমলসার ইউনিয়নের আমলসার কোদলা ৪ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা হয়েও তথ্য জালিয়াতি করে জেলা কোটার বিধিনিষেধ এড়াতে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরি করে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে গোয়ালন্দ উপজেলা জনস্বাস্থ্যে কর্মরত মো. রেজাউল করিমের জন্মস্থান মাগুরা জেলায়। তিনি মাগুরা সদর উপজেলার চাউলিয়া ইউনিয়নের বুজরুক শ্রীকুন্ডী ৯ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা হয়েও তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে জেলা কোটার বিধিনিষেধ এড়াতে ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরি করছেন।

একইরকম ভাবে বেগম মর্জিনা খাতুনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে। বেগম মর্জিনা খাতুনের জন্মস্থান মাগুরা। তার জাতীয় পরিচয়পত্র অনুসারে স্থায়ী অস্থায়ী ঠিকানা ও মাধ্যমিকের একাডেমিক তথ্য অনুসারে মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের বেথুলিয়া ৯ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা হয়েও ঢাকা জেলার তথ্য দিয়ে জেলা কোটার বিধিনিষেধ এড়াতে তথ্য জালিয়াতি করে নিয়োগ নিয়েছেন। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র, পারিবারিক বসবাস, পৈতৃক নিবাস ও স্থানীয় পরিচয় মাগুরা জেলার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও চাকরির আবেদনপত্রে ঢাকা জেলার বিভিন্ন উপজেলার ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগের সত্যতা রয়েছে।

সরকারি চাকরিতে জেলা কোটার বিধান এড়াতে যদি প্রকৃত ঠিকানা গোপন করে ভিন্ন জেলার পরিচয়ে নিয়োগ নেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা শুধু নিয়োগবিধির লঙ্ঘন নয়; প্রয়োজনীয় উপাদান প্রমাণিত হলে তা প্রতারণা, মিথ্যা তথ্য প্রদান এবং সরকারি চাকরি গ্রহণে গুরুতর অনিয়মের বিষয়ও হতে পারে।

আইনজ্ঞদের মতে, কোনো সরকারি চাকরিতে আবেদন করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে স্থায়ী ঠিকানা, জন্মস্থান বা জেলা সংক্রান্ত তথ্য গোপন বা ভিন্ন তথ্য প্রদান করা হলে তা প্রতারণা ও মিথ্যা তথ্য প্রদানের শামিল হতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, চাকরি বাতিল বা অপসারণের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী দণ্ডবিধির ৪২০ (প্রতারণা), ৪৬৫, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় ফৌজদারি অপরাধের প্রশ্নও উঠতে পারে। যদি প্রভাব খাটিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি চাকরি গ্রহণের প্রমাণ মেলে, তবে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের আওতায়ও আসতে পারে।

প্রশ্ন উঠেছে—আবেদন যাচাইয়ের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, এসএসসি ও এইচএসসি সনদ, পৈতৃক ঠিকানা এবং অন্যান্য তথ্য কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল? সংশ্লিষ্ট যাচাই কমিটি কি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল, নাকি প্রভাবশালী কোনো মহলের সহায়তায় এসব নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে?

এ ঘটনায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া, আবেদনপত্র, যাচাই প্রতিবেদন, পুলিশ ভেরিফিকেশন, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন এবং শিক্ষাগত নথি পুনঃযাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অনিয়মের মাধ্যমে পাওয়া চাকরি বাতিলের দাবিও উঠেছে সচেতন মহলে।

সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে উক্ত ব্যক্তিবর্গ প্রতিবেদকের কণ্ঠ রোধের জন্য বিভিন্ন মহল দিয়ে অনৈতিক প্রস্তাবসহ সংবাদ প্রকাশ বন্ধের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী পর্বে….!

15 September 2026

প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় ভুয়া ঠিকানায় চাকরি

জনপ্রিয়

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের এজিএম নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে সাবেক নারী কর্মীর শ্লীলতাহানির মামলা

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলে জালিয়াতির নিয়োগ

প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় ভুয়া ঠিকানায় চাকরি

আপডেট সময় : ১০:৫৪:৩৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

বিধান কুমার বিশ্বাস: জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) নলকূপ মেকানিক পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ অনিয়ম, তথ্য গোপন ও ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে এমন একাধিক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে জেলা কোটার বিধিনিষেধ এড়াতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে নিজ জেলার পরিচয় গোপন করে অন্য জেলার বাসিন্দা সেজে সরকারি চাকরি নিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১১ ও ২০১২ সালের নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়েও একই ধরনের কৌশলে একাধিক ব্যক্তি চাকরি লাভ করেন। সংশ্লিষ্ট সময়ে (২০০৯-২০১৪) জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন মাগুরা জেলার মো. নুরুজ্জামান। অভিযোগ অনুযায়ী, তার দায়িত্বকালেই মাগুরা জেলার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থী নিজ জেলার তথ্য গোপন করে ঢাকা জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা হিসেবে আবেদন করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রতিবন্ধী কোটা ছাড়া মাগুরা জেলার সাধারণ প্রার্থীদের জন্য জেলা কোটা ছিল না। অভিযোগ রয়েছে, এই সীমাবদ্ধতা এড়াতে প্রার্থীরা পৈতৃক নিবাস, স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানা, জন্মস্থান, এমনকি পারিবারিক পরিচয় গোপন বা পরিবর্তন করে ঢাকা জেলার বাসিন্দা হিসেবে আবেদন করেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেরই জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ, পৈতৃক ভিটা, পারিবারিক বসবাস এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অবস্থান মাগুরা জেলায় হলেও চাকরির আবেদনপত্রে ঢাকা জেলার ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে ফরিদপুর সার্কেলের অধীন রাজবাড়ী জেলার চারটি উপজেলার পাঁচজন নলকূপ মেকানিকের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তারা হলেন—
পাংশা উপজেলা: মো. আলহাজ্ব হোসেন, গোয়ালন্দ উপজেলা: মো. রেজাউল করিম ও বেগম মর্জিনা খাতুন, রাজবাড়ী সদর উপজেলা: শাহীন শিকদার, কালুখালী উপজেলা: মো. হাসিব হাসান।
স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধান, বিভিন্ন সরকারি নথি, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত তথ্য এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে সবচেয়ে আলোচিত নাম মো. হাসিব হাসান। ১৭ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি (স্মারক নং-৪৬.০৩.২৬০০.০৮১.১১.২৩৩.১৮-৬৯৪৮)-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, মাগুরাসহ কয়েকটি জেলার সাধারণ প্রার্থীরা আবেদন করতে পারবেন না। কেবল এতিম ও প্রতিবন্ধী কোটার প্রার্থীদের জন্য ব্যতিক্রম রাখা হয়েছিল।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার আমলসার ইউনিয়নের কালীনগর (কুরুন্দী) গ্রামের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও তিনি আবেদনপত্রে ঢাকা জেলার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের সুভাঢ্যা চৌধুরীপাড়া এলাকার বাসিন্দা হিসেবে তথ্য প্রদান করেন।

অনুসন্ধানে পাওয়া জন্মনিবন্ধন সনদে তার গ্রামের ঠিকানা কালীনগর, ইউনিয়ন আমলসার, উপজেলা শ্রীপুর, জেলা মাগুরা উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া তার শিক্ষাজীবনের তথ্যেও মাগুরা জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়। তার জাতীয় পরিচয় পত্রেও স্থায়ী অস্থায়ী ঠিকানা ও জন্মস্থান হিসেবে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার আমলসার ইউনিয়নের কালীনগর (কুরুন্দী) ৬ নং ওয়ার্ড উল্লেখ রয়েছে।

২২ অক্টোবর ২০১২ সালের অফিস আদেশে (স্মারক নং-১৫৪৩ জঃসাঃপ্রঃঅঃ (এফসি)) ১৩ নম্বর ক্রমিকে রোল নম্বর ২৯৩৩-এর প্রার্থী শাহীন শিকদারকে ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার ছোট বকসনগর গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তবে অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, ওই ঠিকানায় তার কোনো জমি, বসতভিটা কিংবা স্থায়ী বসবাসের ইতিহাস পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে তার জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মস্থান এবং স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা হিসেবে মাগুরা সদর উপজেলার পুকুরিয়া গ্রামের তথ্য রয়েছে বলে নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়।

একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে পাংশা উপজেলা জনস্বাস্থ্যে কর্মরত মো. আলহাজ্ব হোসেনের বিরুদ্ধে! তার জন্মস্থান মাগুরা। তিনি ২০১২ সালে ভোটার হন। তার জন্ম সনদ ও জাতীয় পরিচয় পত্রে এবং মাধ্যমিকে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার আমলসার ইউনিয়নের আমলসার কোদলা ৪ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা হয়েও তথ্য জালিয়াতি করে জেলা কোটার বিধিনিষেধ এড়াতে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরি করে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে গোয়ালন্দ উপজেলা জনস্বাস্থ্যে কর্মরত মো. রেজাউল করিমের জন্মস্থান মাগুরা জেলায়। তিনি মাগুরা সদর উপজেলার চাউলিয়া ইউনিয়নের বুজরুক শ্রীকুন্ডী ৯ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা হয়েও তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে জেলা কোটার বিধিনিষেধ এড়াতে ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরি করছেন।

একইরকম ভাবে বেগম মর্জিনা খাতুনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে। বেগম মর্জিনা খাতুনের জন্মস্থান মাগুরা। তার জাতীয় পরিচয়পত্র অনুসারে স্থায়ী অস্থায়ী ঠিকানা ও মাধ্যমিকের একাডেমিক তথ্য অনুসারে মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের বেথুলিয়া ৯ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা হয়েও ঢাকা জেলার তথ্য দিয়ে জেলা কোটার বিধিনিষেধ এড়াতে তথ্য জালিয়াতি করে নিয়োগ নিয়েছেন। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র, পারিবারিক বসবাস, পৈতৃক নিবাস ও স্থানীয় পরিচয় মাগুরা জেলার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও চাকরির আবেদনপত্রে ঢাকা জেলার বিভিন্ন উপজেলার ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগের সত্যতা রয়েছে।

সরকারি চাকরিতে জেলা কোটার বিধান এড়াতে যদি প্রকৃত ঠিকানা গোপন করে ভিন্ন জেলার পরিচয়ে নিয়োগ নেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা শুধু নিয়োগবিধির লঙ্ঘন নয়; প্রয়োজনীয় উপাদান প্রমাণিত হলে তা প্রতারণা, মিথ্যা তথ্য প্রদান এবং সরকারি চাকরি গ্রহণে গুরুতর অনিয়মের বিষয়ও হতে পারে।

আইনজ্ঞদের মতে, কোনো সরকারি চাকরিতে আবেদন করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে স্থায়ী ঠিকানা, জন্মস্থান বা জেলা সংক্রান্ত তথ্য গোপন বা ভিন্ন তথ্য প্রদান করা হলে তা প্রতারণা ও মিথ্যা তথ্য প্রদানের শামিল হতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, চাকরি বাতিল বা অপসারণের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী দণ্ডবিধির ৪২০ (প্রতারণা), ৪৬৫, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় ফৌজদারি অপরাধের প্রশ্নও উঠতে পারে। যদি প্রভাব খাটিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি চাকরি গ্রহণের প্রমাণ মেলে, তবে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের আওতায়ও আসতে পারে।

প্রশ্ন উঠেছে—আবেদন যাচাইয়ের সময় জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, এসএসসি ও এইচএসসি সনদ, পৈতৃক ঠিকানা এবং অন্যান্য তথ্য কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল? সংশ্লিষ্ট যাচাই কমিটি কি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল, নাকি প্রভাবশালী কোনো মহলের সহায়তায় এসব নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে?

এ ঘটনায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া, আবেদনপত্র, যাচাই প্রতিবেদন, পুলিশ ভেরিফিকেশন, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন এবং শিক্ষাগত নথি পুনঃযাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অনিয়মের মাধ্যমে পাওয়া চাকরি বাতিলের দাবিও উঠেছে সচেতন মহলে।

সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে উক্ত ব্যক্তিবর্গ প্রতিবেদকের কণ্ঠ রোধের জন্য বিভিন্ন মহল দিয়ে অনৈতিক প্রস্তাবসহ সংবাদ প্রকাশ বন্ধের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী পর্বে….!

15 September 2026

প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় ভুয়া ঠিকানায় চাকরি