পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কর্মকর্তাদের জন্য পাঁচ দিনব্যাপী বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেনসিক সায়েন্স অ্যান্ড সাইবার সিকিউরিটি (আইএফএসসিএস)-এর উদ্যোগে “অ্যাপ্লিকেশন অব ফরেনসিক সায়েন্স ইন ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশনস: ফ্রম ক্রাইম সিন টু দ্য কোর্টরুম” (Application of Forensic Science in Criminal Investigations: From Crime Scene to the Courtroom) শীর্ষক এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এই প্রশিক্ষণে পিবিআইয়ের ৩০ জন কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করছেন।
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআই সদর দপ্তরে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ।
অনুষ্ঠানে পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামালের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. নাজমুল হোসাইন। প্রশিক্ষণ কর্মসূচিটি আগামী ১ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত চলবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, একটি মামলার তদন্তে ছোট একটি আলামতও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠতে পারে। তাই অপরাধস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরীক্ষাগারে পাঠানো, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং আদালতে উপস্থাপন—তদন্তের প্রতিটি ধাপে সতর্কতা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি।
তিনি বলেন, বর্তমানে অপরাধের ধরন যেমন পরিবর্তিত হচ্ছে, তেমনি অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে তদন্তের প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি ফরেনসিক বিজ্ঞান, ডিজিটাল ফরেনসিক, ডিএনএ বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং অন্যান্য উদীয়মান প্রযুক্তিকে আরও কার্যকরভাবে তদন্তপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
ডিজিটাল ডিভাইস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে তদন্তে ডিজিটাল আলামতের গুরুত্বও বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডিএনএ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ফরেনসিক প্যাথলজি, ডিজিটাল ফরেনসিক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি তদন্তে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার করলেই হবে না; এর সীমাবদ্ধতা, প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রাপ্ত তথ্য সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করার বিষয়টিও তদন্ত কর্মকর্তাদের জানতে হবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণাকে দেশের বাস্তব সমস্যা সমাধানে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. আমানুল্লাহ বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চশিক্ষার একটি বড় অংশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান, গবেষণা ও বিশেষায়িত দক্ষতা দেশের বাস্তব সমস্যা সমাধানে কাজে লাগুক। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের জন্য এ ধরনের প্রয়োগমুখী প্রশিক্ষণ সেই লক্ষ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তিনি জানান, ভবিষ্যতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের প্রয়োজন অনুযায়ী এ ধরনের প্রশিক্ষণ আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
পাঁচ দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণে অপরাধস্থল ব্যবস্থাপনা, শারীরিক ও জৈবিক আলামত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্যাকেজিং, চেইন অব কাস্টডি, পরীক্ষাগারে আলামত পাঠানো ও ট্র্যাকিং, ফরেনসিক ডিএনএ, ফরেনসিক প্যাথলজি ও টক্সিকোলজি, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবহারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।
প্রশিক্ষণের অন্যতম লক্ষ্য হলো অপরাধ তদন্তে নির্ভুল, নির্ভরযোগ্য ও ব্যয়সাশ্রয়ী বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে শারীরিক ও ডিজিটাল প্রমাণ যথাযথভাবে শনাক্ত ও বিশ্লেষণ এবং তদন্ত থেকে আদালত পর্যন্ত এসব প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করাও এ প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য।
প্রশিক্ষণের বিভিন্ন সেশনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পিবিআই, সিআইডি, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা রিসোর্স পারসন হিসেবে অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন—সাবেক সিনিয়র জেলা জজ আবু সায়েদ দিলজার হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজিপি ড. মো. মতিয়ার রহমান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএফএসসিএস-এর প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিন কাশেম, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত ডিআইজি জান্নাতুল হাসান, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. উম্মে শারাবান তাহুরা, সিনিয়র সহকারী সচিব সাঈদ মো. সাফায়েত, পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শিবলী নোমান, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সিরাজুল ইসলাম, রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ডা. নন্দিতা মালাকার, সিআইডির সাথী রানি শর্মা, ক্রাইম সিন ইউনিটের গাজী গোলাম দস্তগীর, সিআইডির ফরেনসিক ইউনিটের এ বি এম আতিকুর রহমান, সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষক মো. আশরাফুল আলম এবং সিআইডির গোলাম আমবিয়া মাহমুদসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথের স্কুল অব ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড ক্রিমিনাল জাস্টিসের ফরেনসিক স্টাডিজের সিনিয়র লেকচারার ড. হেলেন আরওয়াকার অনলাইনে ‘‘সিগনিফিকেন্স এন্ড ইমপ্যাক্ট অব ফরেনসিক ইভিডেন্স’ (Significance and Impact of Forensic Evidence) বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেবেন।
প্রশিক্ষণে ‘ফরেনসিক ফাইন্ডিং থেকে জুডিশিয়াল ফাইন্ডিং’, ‘অপরাধ তদন্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার’, ‘ফরেনসিক রিপোর্ট ও বিশেষজ্ঞ সাক্ষ্য’, ‘ফরেনসিক প্রমাণের সীমাবদ্ধতা’ এবং ‘পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ ও মানবাধিকার’সহ বিভিন্ন বিষয়ে মোট ২৪টি সেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রশিক্ষণ কর্মসূচির কোর্স কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএফএসসিএস-এর প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ বিন কাশেম। উদ্বোধনী পর্বে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ ও আইএফএসসিএস-এর প্রভাষক খাতুনে জান্নাতের সঞ্চালনায় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পুলিশের ডিআইজি সুজায়েত ইসলাম, ডিআইজি আবুল কালাম আজাদ, অতিরিক্ত ডিআইজি আলিমুজ্জামান, কোর্স পরিচালক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিসেস সামিরা সুলতানা, কোর্স সমন্বয়ক মো. আরিফুল ইসলাম, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন এক্সপার্ট গৌতম বড়ুয়া, জনসংযোগ দপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) তাইয়েবা তাসনীম সিরাজ প্রমুখ। প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারী পিবিআই কর্মকর্তাদের মধ্যে সনদপত্র বিতরণ করা হবে।






















