০৩:২০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আসামে মুসলিম উচ্ছেদ: আদানি-অম্বানির কর্পোরেট স্বর্গরাজ্য?

  • আপডেট সময় : ০৮:৫৯:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
  • 26

আসামে মুসলিম উচ্ছেদ: আদানি-অম্বানির কর্পোরেট স্বর্গরাজ্য?

আসামের ৭৮,৪৩৮ বর্গকিলোমিটার ভৌগোলিক আয়তনের মধ্যে রয়েছে ব্রহ্মপুত্র ও বরাক উপত্যকা এবং দুটি পাহাড়ি জেলা। ৫০টিরও বেশি উপনদীসংবলিত নদীমাতৃক এই আসামে প্রাকৃতিক রূপ আজ এক ভয়াবহ ভূমি সংকটে রূপ নিয়েছে। সরকারি তথ্য ও ‘ইকোনমিক সার্ভে অব আসাম’ অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর থেকে অব্যাহত বন্যা ও নদীভাঙনে রাজ্যের ৪.২৭ লাখ হেক্টরেরও বেশি জমি (মোট আয়তনের প্রায় ৭.৫%) স্থায়ীভাবে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ হেক্টরের উর্বর জমি বিলীন হওয়ায় স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ গৃহহীন ও ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন।

তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে আসাম সরকারের প্রশাসনিক পদক্ষেপ। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে “জবরদখল মুক্ত” করার নামে রাজ্যজুড়ে অন্তত ৩৩টি বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, যার ফলে ২২,০০০টিরও বেশি বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়ে ১ লক্ষাধিক মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা হয়। সমালোচক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই অভিযানে ক্ষতিগ্রস্তদের ৯০ শতাংশেরও বেশি ধর্মীয় সংখ্যালঘু (মুসলিম)। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে বছরের পর বছর ধরে জীবনসংগ্রাম করা এসব মানুষকে পুনর্বাসন না দিয়ে ‘বাংলাদেশি’ বা ‘বহিরাগত’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা মূলতঃ রাজনৈতিক ফায়দা লোটা ও সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটব্যাঙ্ক নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই করা হচ্ছে বলে নাগরিক সমাজের অভিযোগ। অন্যদিকে, উচ্ছেদ করা সরকারি ও কৃষি জমি পানির দরে বড় বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

এই কর্পোরেট তোষণের অংশ হিসেবে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ধুবড়ী জেলার চাপর রাজস্ব সার্কুলারে ১,৪০০টিরও বেশি পরিবারকে উচ্ছেদ করে ১০,০০০ মানুষকে গৃহহীন করার পর, সেই ৩,৫০০ বিঘারও বেশি জমি আদানি গ্রুপের ৩,২০০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য হস্তান্তর করা হয়। তাছাড়া গুয়াহাটি বিমানবন্দরের পরিচালন ক্ষমতা ৫০ বছরের জন্য আদানিদের দেওয়ার পাশাপাশি অ্যারোট্রোপলিসের জন্য আরও ৪০০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। একইভাবে কার্বি আংলং স্বায়ত্তশাসিত উপজাতীয় অঞ্চলে ۱,০০০ মেগাওয়াটের মেগা সোলার প্রজেক্টের জন্য অম্বানি গ্রুপকে ۶,০০০ একর জমি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা স্থানীয় উপজাতিদের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর প্ল্যান্টের জন্য টাটা গ্রুপকে ৫১৫ একর, পতঞ্জলি আয়ুর্বেদকে হাজার হাজার বিঘা এবং মহাবল সিমেন্টসকে (জে কে লক্ষ্মী) ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত সংরক্ষিত এলাকার ৩,০০০ বিঘা জমি দেওয়া হয়েছে—যা নিয়ে গুয়াহাটি হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছে।

রাজ্যের জেলায় জেলায় উচ্ছেদ অভিযানের রূপ অত্যন্ত ভয়াবহ। গোলপাড়ায় একাধিক অভিযানে ২,২৯৯টি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং পুলিশের গুলিতে এক নাগরিকের মৃত্যু ঘটেছে। দারাং (ঢালপুর ও গোরুখুটি)-এ ২,০৫১টিরও বেশি পরিবারকে উচ্ছেদ করে ১০,০০০ মানুষকে গৃহহীন করা হয়েছে, যাদের হাইকোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির। হোজাইয়ের লামডিং বনাঞ্চলে ৫৫০টিরও বেশি উপজাতীয় (গারো, চাকমা) ও সংখ্যালঘু পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, যারা বর্তমানে চরম পুষ্টিহীনতায় তাঁবুতে বাস করছে। এছাড়া কামরূপ মেট্রোয় (কচুতলি ও সিলসাকো) ৩,০০০টিরও বেশি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং লখিমপুর, শোণিতপুর ও নগাঁওয়ে শত শত সংখ্যালঘু পরিবার উচ্ছেদ হয়ে সরকারি সাহায্য ছাড়াই ভাসমান জীবনযাপনে বাধ্য হয়েছে।

এই গণ-উচ্ছেদ ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ (মর্যাদাপূর্ণ জীবন ও বাসস্থানের অধিকার) এবং ২১এ অনুচ্ছেদ (শিশুদের শিক্ষার অধিকার)-এর সরাসরি লঙ্ঘন, যার ফলে হাজার হাজার শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে এবং জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকেও বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো বঞ্চিত হচ্ছে। এই সংকট নিরসনে বিশেষজ্ঞরা পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন: ১. উচ্ছেদের অন্তত ৩ মাস আগে আইনি নোটিশ প্রদান, ২. স্থায়ী বাসস্থান ও বিকল্প জমি নিশ্চিত না করে উচ্ছেদ না করা, ৩. ত্রাণ শিবিরে সুপেয় পানি, স্বাস্থ্য ও শৌচাগার নিশ্চিত করা, ৪. বাস্তুচ্যুত শিশুদের নিকটস্থ স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করা, এবং ৫. কর্পোরেটদের জমি দেওয়ার আগে স্থানীয় ভূমিহীনদের প্রকল্পে অংশীদার করা ও পুনর্বাসনের খরচ কর্পোরেটদের বহন করা।

একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে রিফ্যুজি হওয়া মানুষ, আর অন্যদিকে সরকারের উচ্ছেদ নীতি ও কর্পোরেট তোষণ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে আসামের সাধারণ জনগণ আজ পিষ্ট। আইনের শাসন ও মানবিকতার ভারসাম্য না আনলে রাজ্যটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ভবিষ্যতে চরম হুমকির মুখে পড়বে।

20 October 2026

আসামে মুসলিম উচ্ছেদ: আদানি-অম্বানির কর্পোরেট স্বর্গরাজ্য?

Spread the love
জনপ্রিয়

অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় সুপ্রিম কোর্টে ফায়ার সার্ভিসের মহড়া

আসামে মুসলিম উচ্ছেদ: আদানি-অম্বানির কর্পোরেট স্বর্গরাজ্য?

আপডেট সময় : ০৮:৫৯:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

আসামের ৭৮,৪৩৮ বর্গকিলোমিটার ভৌগোলিক আয়তনের মধ্যে রয়েছে ব্রহ্মপুত্র ও বরাক উপত্যকা এবং দুটি পাহাড়ি জেলা। ৫০টিরও বেশি উপনদীসংবলিত নদীমাতৃক এই আসামে প্রাকৃতিক রূপ আজ এক ভয়াবহ ভূমি সংকটে রূপ নিয়েছে। সরকারি তথ্য ও ‘ইকোনমিক সার্ভে অব আসাম’ অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর থেকে অব্যাহত বন্যা ও নদীভাঙনে রাজ্যের ৪.২৭ লাখ হেক্টরেরও বেশি জমি (মোট আয়তনের প্রায় ৭.৫%) স্থায়ীভাবে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ হেক্টরের উর্বর জমি বিলীন হওয়ায় স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ গৃহহীন ও ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন।

তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে আসাম সরকারের প্রশাসনিক পদক্ষেপ। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে “জবরদখল মুক্ত” করার নামে রাজ্যজুড়ে অন্তত ৩৩টি বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, যার ফলে ২২,০০০টিরও বেশি বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়ে ১ লক্ষাধিক মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা হয়। সমালোচক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই অভিযানে ক্ষতিগ্রস্তদের ৯০ শতাংশেরও বেশি ধর্মীয় সংখ্যালঘু (মুসলিম)। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে বছরের পর বছর ধরে জীবনসংগ্রাম করা এসব মানুষকে পুনর্বাসন না দিয়ে ‘বাংলাদেশি’ বা ‘বহিরাগত’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা মূলতঃ রাজনৈতিক ফায়দা লোটা ও সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটব্যাঙ্ক নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই করা হচ্ছে বলে নাগরিক সমাজের অভিযোগ। অন্যদিকে, উচ্ছেদ করা সরকারি ও কৃষি জমি পানির দরে বড় বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

এই কর্পোরেট তোষণের অংশ হিসেবে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ধুবড়ী জেলার চাপর রাজস্ব সার্কুলারে ১,৪০০টিরও বেশি পরিবারকে উচ্ছেদ করে ১০,০০০ মানুষকে গৃহহীন করার পর, সেই ৩,৫০০ বিঘারও বেশি জমি আদানি গ্রুপের ৩,২০০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য হস্তান্তর করা হয়। তাছাড়া গুয়াহাটি বিমানবন্দরের পরিচালন ক্ষমতা ৫০ বছরের জন্য আদানিদের দেওয়ার পাশাপাশি অ্যারোট্রোপলিসের জন্য আরও ৪০০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। একইভাবে কার্বি আংলং স্বায়ত্তশাসিত উপজাতীয় অঞ্চলে ۱,০০০ মেগাওয়াটের মেগা সোলার প্রজেক্টের জন্য অম্বানি গ্রুপকে ۶,০০০ একর জমি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা স্থানীয় উপজাতিদের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর প্ল্যান্টের জন্য টাটা গ্রুপকে ৫১৫ একর, পতঞ্জলি আয়ুর্বেদকে হাজার হাজার বিঘা এবং মহাবল সিমেন্টসকে (জে কে লক্ষ্মী) ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত সংরক্ষিত এলাকার ৩,০০০ বিঘা জমি দেওয়া হয়েছে—যা নিয়ে গুয়াহাটি হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছে।

রাজ্যের জেলায় জেলায় উচ্ছেদ অভিযানের রূপ অত্যন্ত ভয়াবহ। গোলপাড়ায় একাধিক অভিযানে ২,২৯৯টি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং পুলিশের গুলিতে এক নাগরিকের মৃত্যু ঘটেছে। দারাং (ঢালপুর ও গোরুখুটি)-এ ২,০৫১টিরও বেশি পরিবারকে উচ্ছেদ করে ১০,০০০ মানুষকে গৃহহীন করা হয়েছে, যাদের হাইকোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির। হোজাইয়ের লামডিং বনাঞ্চলে ৫৫০টিরও বেশি উপজাতীয় (গারো, চাকমা) ও সংখ্যালঘু পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, যারা বর্তমানে চরম পুষ্টিহীনতায় তাঁবুতে বাস করছে। এছাড়া কামরূপ মেট্রোয় (কচুতলি ও সিলসাকো) ৩,০০০টিরও বেশি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং লখিমপুর, শোণিতপুর ও নগাঁওয়ে শত শত সংখ্যালঘু পরিবার উচ্ছেদ হয়ে সরকারি সাহায্য ছাড়াই ভাসমান জীবনযাপনে বাধ্য হয়েছে।

এই গণ-উচ্ছেদ ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ (মর্যাদাপূর্ণ জীবন ও বাসস্থানের অধিকার) এবং ২১এ অনুচ্ছেদ (শিশুদের শিক্ষার অধিকার)-এর সরাসরি লঙ্ঘন, যার ফলে হাজার হাজার শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে এবং জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকেও বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো বঞ্চিত হচ্ছে। এই সংকট নিরসনে বিশেষজ্ঞরা পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন: ১. উচ্ছেদের অন্তত ৩ মাস আগে আইনি নোটিশ প্রদান, ২. স্থায়ী বাসস্থান ও বিকল্প জমি নিশ্চিত না করে উচ্ছেদ না করা, ৩. ত্রাণ শিবিরে সুপেয় পানি, স্বাস্থ্য ও শৌচাগার নিশ্চিত করা, ৪. বাস্তুচ্যুত শিশুদের নিকটস্থ স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করা, এবং ৫. কর্পোরেটদের জমি দেওয়ার আগে স্থানীয় ভূমিহীনদের প্রকল্পে অংশীদার করা ও পুনর্বাসনের খরচ কর্পোরেটদের বহন করা।

একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে রিফ্যুজি হওয়া মানুষ, আর অন্যদিকে সরকারের উচ্ছেদ নীতি ও কর্পোরেট তোষণ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে আসামের সাধারণ জনগণ আজ পিষ্ট। আইনের শাসন ও মানবিকতার ভারসাম্য না আনলে রাজ্যটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ভবিষ্যতে চরম হুমকির মুখে পড়বে।

20 October 2026

আসামে মুসলিম উচ্ছেদ: আদানি-অম্বানির কর্পোরেট স্বর্গরাজ্য?

Spread the love