নওগাঁয় আমের মৌসুম শেষ হয়েছে বেশ আগেই। আম্রপালি, নাক ফজলি, হিমসাগর, হাঁড়িভাঙা, ল্যাংড়া, গোপালভোগসহ পরিচিত জাতের আম এখন বাজারে নেই। তবে আমের সেই শূন্যতা পূরণ করে এখনও বাজার ধরে রেখেছে বারোমাসি জাতের কাটিমন আম। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এসেও জেলার সাপাহার উপজেলার আমের বাজারে সারি সারি কাটিমন আমের উপস্থিতি পথচারী ও ক্রেতাদের নজর কাড়ছে। অফ সিজনে এমন আমের বাজার দেখে অনেকেই বিস্মিত।
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার (১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে নওগাঁর অন্যতম বড় আমের বাজার সাপাহারে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহনে করে বাগান থেকে কাটিমন আম নিয়ে আসছেন। বাজারে সারি করে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন আকার ও মানের আম। বিক্রেতাদের ব্যস্ততা দেখে মনে হচ্ছে, যেন চলছে আমের ভরা মৌসুম।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও এ সময়ে নওগাঁর বাজারে এমন দৃশ্য খুব একটা দেখা যেত না। তবে কাটিমন জাতের আমের চাষ বাড়ায় এখন মৌসুম শেষ হওয়ার পরও বাজারে আমের সরবরাহ থাকছে। ফলে আমপ্রেমীরাও সিজনের বাইরে কিনতে পারছেন নওগাঁর আম।
আমচাষিদের ভাষ্য, সাধারণ জাতের আমের মতো কাটিমনের নির্দিষ্ট একটি মৌসুম নেই। গাছের পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বছরের বিভিন্ন সময়ে ফলন নেওয়া সম্ভব। ফলে অফ সিজনে বাজারে অন্য জাতের আম না থাকায় কাটিমনের চাহিদা ও দাম দুটিই ভালো থাকছে।
সাপাহার উপজেলার হরিপুর গ্রামের আমচাষি মনসুর আলী বলেন, তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে কাটিমন আম চাষ করেছেন। এবার ফলনও ভালো হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রতি মণ আমের দাম ৮ হাজার টাকা চেয়েছি। ব্যাপারীরা সাড়ে ৬ হাজার টাকা বলছে। ৭ হাজার টাকা হলে বিক্রি করব।” তবে আমের মান ও আকারভেদে দাম কম-বেশি হয় বলেও জানান তিনি।
বালুকাডাঙ্গার আমচাষি রেজাউল ও সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এ সময়ে বাজারে অন্য জাতের আম না থাকায় কাটিমনের চাহিদা বেশি। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। আগামী বছর এ জাতের আমের চাষ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।
সাপাহারে ঘুরতে এসে বাড়ির জন্য কাটিমন আম কিনছিলেন স্থানীয় ভোক্তা প্রদীপ। তিনি বলেন, “আগে কখনো এ সময়ে এত আমের বাজার দেখিনি। এখন তো সাধারণভাবে আমের মৌসুম নেই। চোখের সামনে এত সুন্দর আম দেখে কিনতে ইচ্ছে হয়। তাই মাঝে মাঝে বাড়ির জন্য নিয়ে যাই।”
একইভাবে নয়ন ও সিরাজ নামের দুই ক্রেতা বলেন, বাজারের দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছে এখনও আমের মৌসুম চলছে। কাটিমন আম দেখতে ভালো হওয়ায় এবং পরিবারের সদস্যরা আম পছন্দ করায় তারা আম কিনেছেন।
সাপাহার উপজেলার গোয়ালা ইউনিয়নের সারোগডাঙ্গা এলাকার আমচাষি হাফিজুর রহমান ১৬ বিঘা জমিতে কাটিমন আম চাষ করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতি মণ আম প্রায় ৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তার বাগানে এখনও মুকুল রয়েছে। ফলে নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত আম পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
হাফিজুর রহমান বলেন, ২০১৯ সালে তিনি কাটিমন আমের চাষ শুরু করেন। কৃষিবিষয়ক টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এ জাতের আম চাষে আগ্রহী হন। ২০২১ সাল থেকে তার বাগানে ফলন শুরু হয়। বারোমাসি হওয়ায় এ বাগানে সারা বছর ১০-১২ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
একই ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর এলাকার আমচাষি নাসির উদ্দিন বলেন, তিনিও ২০১৯ সালে কাটিমনের চারা লাগান। ইউটিউবের ভিডিও দেখে তিনি এ চাষে আগ্রহী হন এবং ২০২১ সালে সফলতা পান। গত বছর ১৫ বিঘা জমিতে কাটিমন চাষ করলেও এবার তা বাড়িয়ে ৩৭ বিঘা করেছেন। তার বাগানে নয়জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন।
নাসির উদ্দিন বলেন, “কাটিমন চাষ মোটামুটি লাভজনক। তবে পরিশ্রম ও উৎপাদন খরচও আছে। বর্তমানে বাজারে মানভেদে প্রতি মণ আম ৬ হাজার ৩০০ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।”
সাপাহারের টেংরা কুড়ি গ্রামের কৃষক জামাল উদ্দিন ৬০ বিঘা জমিতে কাটিমন আমের বাগান করেছেন। তিনি বলেন, প্রতি বিঘায় ২০ থেকে ২৫ মণ, কখনো ৩০ থেকে ৩৫ মণ পর্যন্ত ফলন হয়। বর্তমানে বাজারে অন্য জাতের আম না থাকায় কাটিমনের চাহিদা বেশি। প্রতি মণ ৪ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। এবার তার বাগান থেকে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার আম বিক্রি হতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।
স্থানীয় আম ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর ও সমর সাহা বলেন, আগে কাটিমন আমের এমন বড় বাজার দেখা যায়নি। এবার বাজারে আমের সরবরাহ বেড়েছে। অনেক কৃষক আগামী বছর আরও বেশি জমিতে কাটিমন চাষের পরিকল্পনা করছেন। অফ সিজনে বাজারে অন্য আম না থাকায় কাটিমনের দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া কৃষকদের কাছ থেকে জানা গেছে, আড্ডা, পোরশার সারাইগাছি, ধামইরহাট ও পত্নীতলা থেকেও অনেকে কাটিমন আম বিক্রি করতে সাপাহারে আসছেন।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জেলার পোরশা, নিয়ামতপুর, পত্নীতলা, রাণীনগরসহ বিভিন্ন উপজেলায়ও বাণিজ্যিকভাবে কাটিমন আমের চাষ হচ্ছে।
সাপাহার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাপলা খাতুন বলেন, বর্তমানে এ উপজেলায় প্রায় ১৫০ হেক্টর জমিতে কাটিমন আম চাষ হচ্ছে। গত বছর এর পরিমাণ ছিল ৯৭ হেক্টর। চাষিরা ভালো দাম পাওয়ায় দিন দিন এ জাতের আম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) রেজাউল করিম বলেন, জেলায় সবচেয়ে বেশি কাটিমন আম চাষ হচ্ছে সাপাহারে। এ ছাড়া পোরশা, নিয়ামতপুর, পত্নীতলা, রাণীনগরসহ অন্যান্য উপজেলায়ও এ জাতের আমের আবাদ বাড়ছে। চলতি বছর জেলায় প্রায় ২৫৫ হেক্টর জমিতে কাটিমন আম চাষ হয়েছে, যা গত বছর ছিল ১৯০ হেক্টর।
তিনি বলেন, অন্যান্য জাতের আম নির্দিষ্ট সময়ে পরিপক্ব হলেও কাটিমনের বিশেষত্ব হলো—কৃষক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বছরে দুই থেকে তিনবার বিভিন্ন সময়ে ফলন নিতে পারেন। এ কারণে অফ সিজনেও বাজারে আম সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। নওগাঁর কাটিমন আম দেশের বিভিন্ন সুপারশপের পাশাপাশি বিদেশেও যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, চলতি মৌসুমে কাটিমন আমের হেক্টরপ্রতি ফলন ১২ থেকে ১৫ টন হতে পারে। ২৫৫ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৩ হাজার ৬০ থেকে ৩ হাজার ৮২৫ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। প্রতি কেজি আমের সর্বনিম্ন দাম ১৫০ টাকা, গড় ১৮০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২০০ টাকা হিসাবে সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৫৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, কাটিমন জাতের আমের বিশেষত্ব হচ্ছে এটি বছরের বিভিন্ন সময়ে চাষ ও উৎপাদন করা যায় এবং কৃষক ভালো দামও পান। চাষিদের আগ্রহের কারণে গত বছরের তুলনায় এবার এ জাতের আমের আবাদ বেড়েছে। নওগাঁয় বর্তমানে মোট আমবাগানের পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর।
জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী চলতি বছর ২২ মে থেকে গুটি জাতের আম সংগ্রহ ও বাজারজাত শুরু হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে গোপালভোগ, ক্ষীরসাপাত বা হিমসাগর, নাক ফজলি, ল্যাংড়া, হাঁড়িভাঙা, ফজলি, আম্রপালি, ব্যানানা ম্যাঙ্গোসহ বিভিন্ন জাতের আম বাজারে আসে। সর্বশেষ আশ্বিনা, বারি-৪, গৌড়মতি ও কাটিনা জাতের আম সংগ্রহের সময় নির্ধারণ করা হয়।
তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই বিভিন্ন জাতের আম বাজারে ওঠায় জুনের মধ্যেই নওগাঁর বড় বড় আমের বাজারে মৌসুমি আমের সরবরাহ কমতে শুরু করে। একপর্যায়ে আম্রপালিসহ কয়েকটি জাতের দামও ভোক্তাদের নাগালের বাইরে চলে যায়। মৌসুমি আমের সেই বাজার শেষ হলেও এখন সাপাহারসহ নওগাঁর বিভিন্ন বাজারে অফ সিজনের আম হিসেবে কাটিমনের সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।
ফলে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের আমের মৌসুম পেরিয়ে ভাদ্রের শেষ প্রান্তেও নওগাঁর বাজারে দেখা মিলছে টাটকা আমের। কৃষকদের বাড়তি আয় ও সারা বছর কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ভোক্তাদেরও অফ সিজনে আম খাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে নওগাঁর আমের বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে কাটিমন।






















