০৮:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুরোনো ‘বেডফোর্ড’ ও ‘ম্যাজিক কার্ড বাণিজ্য; মহাসড়কে মাফিয়া সিন্ডিকেটের রাজত্ব

  • আপডেট সময় : ০৪:৫১:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 38

পুরোনো ‘বেডফোর্ড’ ও ‘ম্যাজিক কার্ড বাণিজ্য; মহাসড়কে মাফিয়া সিন্ডিকেটের রাজত্ব

বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা
সড়কে নামলেই বিকট শব্দ আর কালো ধোঁয়া ছেড়ে ছুটে চলে জরাজীর্ণ ট্রাকের বহর। পেছনের বডিতে জং ধরা হরফে লেখা—‘সাধারণ পরিবহন’ কিংবা ‘সমগ্র বাংলাদেশ ৫ টন’। বিশ্বের প্রায় উন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশেই যে ব্রিটিশ বেডফোর্ড (Bedford) ট্রাক চার দশক আগেই স্থান পেয়েছে জাদুঘরে, সেই চার থেকে ছয় দশক পুরোনো বিপজ্জনক যানবাহনগুলো বাংলাদেশে আজও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজপথ ও মহাসড়কে। বিআরটিএ-এর অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে, ফিটনেসহীন এসব ‘চলন্ত মরণফাঁদ’ দিন-রাত বেপরোয়া গতিতে ছুটছে মাটি ও বালু বহনে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি অনুমোদনহীন এবং আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এসব পুরোনো গাড়ি মহাসড়কে চলাচলের ‘জীবনীশক্তি’ পাচ্ছে কোত্থেকে? অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও শক্তিশালী চাঁদাবাজ চক্রের নাম, যারা অবৈধ ‘টোকেন’ বা ‘ম্যাজিক কার্ড’-এর মাধ্যমে ট্রাফিক পুলিশের অসাধু চক্রকে কিনে নিয়ে রাষ্ট্রীয় আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।

সিএনজি প্রযুক্তিতে পুরান ইঞ্জিনের ‘নতুন জীবন’
সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিক ও মেকানিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ইংল্যান্ডের ভক্সহল মোটরসের তৈরি এই বেডফোর্ড ট্রাকগুলো নব্বইয়ের দশকে উন্নত ও আধুনিক ভারতীয় ডিজেল ট্রাকের দাপটে কিছুটা পিছু হেঁটেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে পুরোনো ডিজেল ইঞ্জিনে সিএনজি (CNG) ফুয়েল সিস্টেম সংযোগের সুযোগ তৈরি হতেই এই ভাঙারি ট্রাকগুলো যেন ‘অমরত্ব’ পেয়ে যায়। বর্তমানে কেবল ঢাকা ও আশপাশের নির্মাণসামগ্রী ও বালু পরিবহনেই প্রায় ১০ হাজারের মতো বেডফোর্ড ট্রাক সড়ক-মহাসড়ক চষে বেড়াচ্ছে। চার থেকে ছয় দশকের পুরোনো জীর্ণ কঙ্কাল সদৃশ এসব ট্রাকে নামমাত্র ব্রেক ও জরাজীর্ণ স্টিয়ারিং ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন ওভারলোড বালু ও মাটি বহন করা হচ্ছে, যা প্রতিনিয়ত ঘটাচ্ছে মরণঘাতী দুর্ঘটনা।

আইন ফাঁকির গোপন হাতিয়ার: তথাকথিত ‘ম্যাজিক কার্ড’
রাজধানী এবং আশপাশের মহাসড়কে এসব অনুমোদনহীন ট্রাকের অবাধ চলাচলের চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে এক বিশেষ ধরনের প্লাস্টিক স্টিকার বা কার্ডে, যাকে পরিবহন চালকরা চেনেন ‘ম্যাজিক কার্ড’ নামে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই কার্ডের একপাশে ছাপা রয়েছে বাহ্যিক কিছু নীতিবাক্য, যেমন—‘ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাবেন না’, ‘টিআই স্যার, সার্জেন্ট ও ট্রাফিক পুলিশ সিগন্যাল দিলে সাথে সাথে গাড়ি থামাবেন’ ইত্যাদি নির্দেশাবলী। কিন্তু কার্ডটির আসল পরিচয় লেখা রয়েছে অপর পিঠে। সেখানে বড় বড় অক্ষরে ছাপা রয়েছে—‘মাসুম ভাই’। সাথে দেওয়া রয়েছে নারায়ণগঞ্জের ঠিকানা এবং কয়েকটি ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর (যেমন: ০১৯০১-১০৬৫০০, ০১৯০১-১০৬৫০৪)।

একাধিক বেডফোর্ড ট্রাক চালকের সাথে কথা বললে তারা গোপন এই বাণিজ্যের রূপরেখা তুলে ধরেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রবীণ চালক জানান:

“আমগো গাড়ির কাগজপত্র, বিআরটিএ-র ফিটনেস কিছুই নাই। পুলিশে গাড়ি ধইরা ডাম্পিংয়ে পাঠাইলে গাড়ি ছাটাইতেই লাখ টাকা শেষ। তাই আমরা প্রতি মাসে নির্দিষ্ট হারে টাকা দিয়া ‘মাসুম ভাই’-এর লোকজনের কাছ থেকে এই রঙিন কার্ড কিনি। কার্ডে নির্দিষ্ট মাসের তারিখ আর কোড নাম্বার থাকে। এই কার্ড উইন্ডশিল্ডে লাগানো থাকলে কিংবা তল্লাশির সময় সার্জেন্টরে দেখাইলে কোনো টিআই বা সার্জেন্ট গাড়ি ধরে না। তারা জানে এই কার্ডের পিছনে কাদের ভাগ আছে।”

সিন্ডিকেটের মূল হোতা: ভোলা থেকে নারায়ণগঞ্জ বিস্তৃত জাল
প্রযুক্তির সাহায্য ও গোপন নথিপত্র (জাতীয় পরিচয়পত্র) পর্যালোচনা করে এই সিন্ডিকেটের মাস্টারমাইন্ড ‘মাসুম ভাই’-এর আসল পরিচয় উন্মোচিত হয়েছে।
জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী:
প্রকৃত নাম: মোঃ আব্বাছ উদ্দিন
ছদ্মনাম/জনপ্রিয় নাম: মাসুম ভাই
পিতার নাম: মোঃ কালু মাঝি
মাতার নাম: বিবি হনুফা
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা: বাসা/হোন্ডিং: কাদির মাঝি বাড়ী, গ্রাম/রাস্তা/মৌজা: হাসানগঞ্জ, ডাকঘর: হাসানগঞ্জ (৮৩৪০), উপজেলা: চর ফ্যাশন, জেলা: ভোলা।
অনুসন্ধান বলছে, ভোলার চরফ্যাশন থেকে উঠে আসা এই আব্বাস উদ্দিন ওরফে মাসুম ভাই নিজেকে নেপথ্যে রেখে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে বিশাল এক চাঁদাবাজ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। তার চক্রটি প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা অবৈধ টোকেন বাণিজ্য থেকে আদায় করছে। আর সংগৃহীত এই টাকার একটি সিংহভাগ চলে যাচ্ছে সড়কের দায়িত্বে থাকা একশ্রেণির অসাধু ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) ও পুলিশ কর্মকর্তার পকেটে। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যেখানে অবৈধ যান জব্দ করার কথা, সেখানে তারা উল্টো এই অপরাধের নীরব পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়েছে।

রাষ্ট্রের বিপুল রাজস্ব ফাঁকি ও জননিরাপত্তা মহাবিপন্ন
অনুমোদনহীন এসব যানবাহন সড়কের জন্য কেবল আতঙ্কের কারণই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির জন্যও এক মস্ত বড় অভিশাপ।
রাজস্ব ক্ষতি: বিআরটিএ-এর নিয়ম অনুযায়ী যানবাহনের রুট পারমিট, ফিটনেস সনদ, ট্যাক্স টোকেন নবায়ন বাবদ সরকার যে রাজস্ব পেত, তা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছে রাষ্ট্র। প্রতিবছর এই সিন্ডিকেটের কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি হচ্ছে।
বাজার ও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি: পণ্যবাহী যানে এমন অবৈধ চাঁদাবাজির প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। বালু ও মাটির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাচ্ছে নির্মাণ খাতে।
নিরাপদ সড়কের হুমকি: বিআরটিএ ও ট্রাফিক আইনকে পাশ কাটিয়ে মেয়াদউত্তীর্ণ ও যান্ত্রিকভাবে অযোগ্য গাড়ি রাস্তায় চলাচল করায় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি কঠোর বার্তা:
মহাসড়কে এই মাফিয়ারাজ কেবল একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতের স্বার্থে রাষ্ট্রের কাছে নিচের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ:
সিন্ডিকেট বিলুপ্ত ও দ্রুত গ্রেফতার: বিভিন্ন ছদ্মনামে পরিচালিত এই চাঁদাবাজ চক্রের মূল হোতা মোঃ আব্বাছ উদ্দিন (ওরফে মাসুম ভাই) সহ এই নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত সকল সদস্যকে অবিলম্বে মানিলন্ডারিং ও চাঁদাবাজি মামলায় গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
অসাধু পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা: যেসব টিআই, ট্রাফিক সার্জেন্ট বা পুলিশ সদস্য ঘুষের বিনিময়ে এই ‘ম্যাজিক কার্ড’-কে ছাড় দিচ্ছেন, তাদেরকে চিহ্নিত করে অবিলম্বে বরখাস্ত ও বিভাগীয় তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
অবৈধ যান স্থায়ীভাবে বাজেয়াপ্ত: ৪০ থেকে ৬০ বছরের পুরোনো সরকারি অনুমোদনহীন ফিটনেসবিহীন সকল বেডফোর্ড ট্রাক অবিলম্বে মহাসড়ক থেকে বাজেয়াপ্ত করে ডাম্পিং ও স্ক্র্যাপ (ভাঙারি) হিসেবে কেটে ফেলার নির্দেশ দিতে হবে।
ডিজিটাল নজরদারি বৃদ্ধি: ম্যানুয়াল কার্ড বা স্টিকারের মাধ্যমে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে মহাসড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা ও ডিজিটাল ভেহিকেল ট্র্যাকিং নিশ্চিত করতে হবে।

যদি এখনই রাষ্ট্র ও সরকারের সর্বোচ্চ মহল এই অবৈধ লেনদেন ও মাফিয়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ না করে, তবে সড়কের শৃঙ্খলা ফেরানো যেমন অবাস্তব স্বপ্নে পরিণত হবে, তেমনি দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে থাকবে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের জীবন।

13 September 2026

পুরোনো ‘বেডফোর্ড’ ও ‘ম্যাজিক কার্ড বাণিজ্য; মহাসড়কে মাফিয়া সিন্ডিকেটের রাজত্ব

জনপ্রিয়

সরকারি সার্ভারের নাগরিক তথ্য অনলাইনে বিক্রি,গ্রেফতার ৫

Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

পুরোনো ‘বেডফোর্ড’ ও ‘ম্যাজিক কার্ড বাণিজ্য; মহাসড়কে মাফিয়া সিন্ডিকেটের রাজত্ব

আপডেট সময় : ০৪:৫১:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা
সড়কে নামলেই বিকট শব্দ আর কালো ধোঁয়া ছেড়ে ছুটে চলে জরাজীর্ণ ট্রাকের বহর। পেছনের বডিতে জং ধরা হরফে লেখা—‘সাধারণ পরিবহন’ কিংবা ‘সমগ্র বাংলাদেশ ৫ টন’। বিশ্বের প্রায় উন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশেই যে ব্রিটিশ বেডফোর্ড (Bedford) ট্রাক চার দশক আগেই স্থান পেয়েছে জাদুঘরে, সেই চার থেকে ছয় দশক পুরোনো বিপজ্জনক যানবাহনগুলো বাংলাদেশে আজও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজপথ ও মহাসড়কে। বিআরটিএ-এর অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে, ফিটনেসহীন এসব ‘চলন্ত মরণফাঁদ’ দিন-রাত বেপরোয়া গতিতে ছুটছে মাটি ও বালু বহনে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি অনুমোদনহীন এবং আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এসব পুরোনো গাড়ি মহাসড়কে চলাচলের ‘জীবনীশক্তি’ পাচ্ছে কোত্থেকে? অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও শক্তিশালী চাঁদাবাজ চক্রের নাম, যারা অবৈধ ‘টোকেন’ বা ‘ম্যাজিক কার্ড’-এর মাধ্যমে ট্রাফিক পুলিশের অসাধু চক্রকে কিনে নিয়ে রাষ্ট্রীয় আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।

সিএনজি প্রযুক্তিতে পুরান ইঞ্জিনের ‘নতুন জীবন’
সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিক ও মেকানিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ইংল্যান্ডের ভক্সহল মোটরসের তৈরি এই বেডফোর্ড ট্রাকগুলো নব্বইয়ের দশকে উন্নত ও আধুনিক ভারতীয় ডিজেল ট্রাকের দাপটে কিছুটা পিছু হেঁটেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে পুরোনো ডিজেল ইঞ্জিনে সিএনজি (CNG) ফুয়েল সিস্টেম সংযোগের সুযোগ তৈরি হতেই এই ভাঙারি ট্রাকগুলো যেন ‘অমরত্ব’ পেয়ে যায়। বর্তমানে কেবল ঢাকা ও আশপাশের নির্মাণসামগ্রী ও বালু পরিবহনেই প্রায় ১০ হাজারের মতো বেডফোর্ড ট্রাক সড়ক-মহাসড়ক চষে বেড়াচ্ছে। চার থেকে ছয় দশকের পুরোনো জীর্ণ কঙ্কাল সদৃশ এসব ট্রাকে নামমাত্র ব্রেক ও জরাজীর্ণ স্টিয়ারিং ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন ওভারলোড বালু ও মাটি বহন করা হচ্ছে, যা প্রতিনিয়ত ঘটাচ্ছে মরণঘাতী দুর্ঘটনা।

আইন ফাঁকির গোপন হাতিয়ার: তথাকথিত ‘ম্যাজিক কার্ড’
রাজধানী এবং আশপাশের মহাসড়কে এসব অনুমোদনহীন ট্রাকের অবাধ চলাচলের চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে এক বিশেষ ধরনের প্লাস্টিক স্টিকার বা কার্ডে, যাকে পরিবহন চালকরা চেনেন ‘ম্যাজিক কার্ড’ নামে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই কার্ডের একপাশে ছাপা রয়েছে বাহ্যিক কিছু নীতিবাক্য, যেমন—‘ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাবেন না’, ‘টিআই স্যার, সার্জেন্ট ও ট্রাফিক পুলিশ সিগন্যাল দিলে সাথে সাথে গাড়ি থামাবেন’ ইত্যাদি নির্দেশাবলী। কিন্তু কার্ডটির আসল পরিচয় লেখা রয়েছে অপর পিঠে। সেখানে বড় বড় অক্ষরে ছাপা রয়েছে—‘মাসুম ভাই’। সাথে দেওয়া রয়েছে নারায়ণগঞ্জের ঠিকানা এবং কয়েকটি ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর (যেমন: ০১৯০১-১০৬৫০০, ০১৯০১-১০৬৫০৪)।

একাধিক বেডফোর্ড ট্রাক চালকের সাথে কথা বললে তারা গোপন এই বাণিজ্যের রূপরেখা তুলে ধরেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রবীণ চালক জানান:

“আমগো গাড়ির কাগজপত্র, বিআরটিএ-র ফিটনেস কিছুই নাই। পুলিশে গাড়ি ধইরা ডাম্পিংয়ে পাঠাইলে গাড়ি ছাটাইতেই লাখ টাকা শেষ। তাই আমরা প্রতি মাসে নির্দিষ্ট হারে টাকা দিয়া ‘মাসুম ভাই’-এর লোকজনের কাছ থেকে এই রঙিন কার্ড কিনি। কার্ডে নির্দিষ্ট মাসের তারিখ আর কোড নাম্বার থাকে। এই কার্ড উইন্ডশিল্ডে লাগানো থাকলে কিংবা তল্লাশির সময় সার্জেন্টরে দেখাইলে কোনো টিআই বা সার্জেন্ট গাড়ি ধরে না। তারা জানে এই কার্ডের পিছনে কাদের ভাগ আছে।”

সিন্ডিকেটের মূল হোতা: ভোলা থেকে নারায়ণগঞ্জ বিস্তৃত জাল
প্রযুক্তির সাহায্য ও গোপন নথিপত্র (জাতীয় পরিচয়পত্র) পর্যালোচনা করে এই সিন্ডিকেটের মাস্টারমাইন্ড ‘মাসুম ভাই’-এর আসল পরিচয় উন্মোচিত হয়েছে।
জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী:
প্রকৃত নাম: মোঃ আব্বাছ উদ্দিন
ছদ্মনাম/জনপ্রিয় নাম: মাসুম ভাই
পিতার নাম: মোঃ কালু মাঝি
মাতার নাম: বিবি হনুফা
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা: বাসা/হোন্ডিং: কাদির মাঝি বাড়ী, গ্রাম/রাস্তা/মৌজা: হাসানগঞ্জ, ডাকঘর: হাসানগঞ্জ (৮৩৪০), উপজেলা: চর ফ্যাশন, জেলা: ভোলা।
অনুসন্ধান বলছে, ভোলার চরফ্যাশন থেকে উঠে আসা এই আব্বাস উদ্দিন ওরফে মাসুম ভাই নিজেকে নেপথ্যে রেখে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে বিশাল এক চাঁদাবাজ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। তার চক্রটি প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা অবৈধ টোকেন বাণিজ্য থেকে আদায় করছে। আর সংগৃহীত এই টাকার একটি সিংহভাগ চলে যাচ্ছে সড়কের দায়িত্বে থাকা একশ্রেণির অসাধু ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) ও পুলিশ কর্মকর্তার পকেটে। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যেখানে অবৈধ যান জব্দ করার কথা, সেখানে তারা উল্টো এই অপরাধের নীরব পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়েছে।

রাষ্ট্রের বিপুল রাজস্ব ফাঁকি ও জননিরাপত্তা মহাবিপন্ন
অনুমোদনহীন এসব যানবাহন সড়কের জন্য কেবল আতঙ্কের কারণই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির জন্যও এক মস্ত বড় অভিশাপ।
রাজস্ব ক্ষতি: বিআরটিএ-এর নিয়ম অনুযায়ী যানবাহনের রুট পারমিট, ফিটনেস সনদ, ট্যাক্স টোকেন নবায়ন বাবদ সরকার যে রাজস্ব পেত, তা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছে রাষ্ট্র। প্রতিবছর এই সিন্ডিকেটের কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি হচ্ছে।
বাজার ও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি: পণ্যবাহী যানে এমন অবৈধ চাঁদাবাজির প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। বালু ও মাটির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাচ্ছে নির্মাণ খাতে।
নিরাপদ সড়কের হুমকি: বিআরটিএ ও ট্রাফিক আইনকে পাশ কাটিয়ে মেয়াদউত্তীর্ণ ও যান্ত্রিকভাবে অযোগ্য গাড়ি রাস্তায় চলাচল করায় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি কঠোর বার্তা:
মহাসড়কে এই মাফিয়ারাজ কেবল একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতের স্বার্থে রাষ্ট্রের কাছে নিচের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ:
সিন্ডিকেট বিলুপ্ত ও দ্রুত গ্রেফতার: বিভিন্ন ছদ্মনামে পরিচালিত এই চাঁদাবাজ চক্রের মূল হোতা মোঃ আব্বাছ উদ্দিন (ওরফে মাসুম ভাই) সহ এই নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত সকল সদস্যকে অবিলম্বে মানিলন্ডারিং ও চাঁদাবাজি মামলায় গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
অসাধু পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা: যেসব টিআই, ট্রাফিক সার্জেন্ট বা পুলিশ সদস্য ঘুষের বিনিময়ে এই ‘ম্যাজিক কার্ড’-কে ছাড় দিচ্ছেন, তাদেরকে চিহ্নিত করে অবিলম্বে বরখাস্ত ও বিভাগীয় তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
অবৈধ যান স্থায়ীভাবে বাজেয়াপ্ত: ৪০ থেকে ৬০ বছরের পুরোনো সরকারি অনুমোদনহীন ফিটনেসবিহীন সকল বেডফোর্ড ট্রাক অবিলম্বে মহাসড়ক থেকে বাজেয়াপ্ত করে ডাম্পিং ও স্ক্র্যাপ (ভাঙারি) হিসেবে কেটে ফেলার নির্দেশ দিতে হবে।
ডিজিটাল নজরদারি বৃদ্ধি: ম্যানুয়াল কার্ড বা স্টিকারের মাধ্যমে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে মহাসড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা ও ডিজিটাল ভেহিকেল ট্র্যাকিং নিশ্চিত করতে হবে।

যদি এখনই রাষ্ট্র ও সরকারের সর্বোচ্চ মহল এই অবৈধ লেনদেন ও মাফিয়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ না করে, তবে সড়কের শৃঙ্খলা ফেরানো যেমন অবাস্তব স্বপ্নে পরিণত হবে, তেমনি দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে থাকবে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের জীবন।

13 September 2026

পুরোনো ‘বেডফোর্ড’ ও ‘ম্যাজিক কার্ড বাণিজ্য; মহাসড়কে মাফিয়া সিন্ডিকেটের রাজত্ব