চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য গৃহীত একটি আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্পে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের মাটি ভরাট কাজের নামে জালিয়াতি করে প্রায় ৪৮ লাখ ৭৭ হাজার ৮৯৪ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই ঘটনায় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের তিন প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার তদন্ত বর্তমানে চলমান। তবে তদন্তের এই পর্যায়েই প্রকল্পের থমকে থাকা কাজ পুনরায় শুরু করার ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা নেই বলে মতামত দিয়েছে দুদক।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৯ জুলাই গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মন্ত্রী কর্তৃক চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার কিসমত জাফরাবাদ মৌজায় ‘সাইট এন্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। পুরো প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৪২ কোটি ৩৭ লক্ষ ২১ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রকল্পের মাটি ভরাট, আরসিসি রাস্তা, ড্রেন ও কালভার্ট নির্মাণ কাজের জন্য ৭ কোটি ৫৬ লক্ষ ৩২,৭৯৮ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
মাটি ভরাটের কাজ পায় যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স হক কনস্ট্রাকশন প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট এন্ড মেসার্স ইউটি মং জেভি’। কাজ শেষে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ৮৭,০৯৩.১৬ ঘন মিটার মাটি ভরাটের দাবি করে মোট ১,৯৯,৬৬,০১৬.৩ টাকার বিল দাখিল করে। ভ্যাট, আইটি ও জামানত বাদে তাদের ১ কোটি ৩৭ লক্ষ ৭৬,৬১৪ টাকা পরিশোধও করে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ।
পরবর্তীতে দুদকের নির্দেশে নিরপেক্ষ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকার মাটি ভরাট কাজ সরেজমিনে পরিমাপ করা হলে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। পরিমাপ প্রতিবেদনে দেখা যায়, নথিপত্রে ৮৭,০৯৩.১৬ ঘনমিটার মাটি ভরাটের কথা বলা হলেও বাস্তবে মাত্র ৪৩,১২৯.৬২৮ ঘনমিটার মাটি ভরাট করা হয়েছে। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি কাজ না করেই ভুয়া বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। প্রকৃত কাজের হিসাব অনুযায়ী বিলের পরিমাণ হওয়ার কথা ছিল ৮৮,৯৮,৭২০ টাকা। ফলে পারস্পরিক যোগসাজশে সর্বমোট ৪৮,৭৭,৮৯৪ টাকা সরাসরি আত্মসাৎ প্রমাণিত হয়।
এ ঘটনায় দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২ এর তৎকালীন সহকারী পরিচালক ইমরান খান অপুর অনুসন্ধানের প্রেক্ষিতে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় একটি মামলা (মামলা নং-০১, তারিখ: ২৭/০২/২০২৫) দায়ের করা হয়। মামলায় অভিযুক্ত আসামিরা হলেন, সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদ, সাবেক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোঃ অলিউল ইসলাম, উপসহকারী প্রকৌশলী আশরাফুজ্জামান এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হক কন্সট্রাকশন প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট এন্ড মেসার্স ইউটি মং জেভির পার্টনার ইনচার্জ মাঈনুল কবির।
দুর্নীতির মামলার মূল অভিযুক্ত এই কর্মকর্তারা বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ও প্রমোশনাল বদলি পেয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার তদন্ত চলমান থাকা অবস্থাতেই জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) এই কর্মকর্তাদের বড় বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত চট্টগ্রামের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদকে শাস্তি দেওয়ার বদলে উল্টো ঢাকার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়েছে। বর্তমানে তাকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের জন্য ফ্ল্যাট প্রকল্পসহ ঢাকার প্রায় ১২০০ কোটি টাকার দুটি বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সাবেক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. অলিউল ইসলাম মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও তাকে ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ের পরিকল্পনা ও ডিজাইন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কর্তৃপক্ষের শীর্ষ প্রশাসনের অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে কাজ করছেন এবং তার বিরুদ্ধে নতুন করে বিভিন্ন অভিযোগও উঠেছে। বহাল তবিয়তে রয়েছেন মামলার আরেক আসামি উপসহকারী প্রকৌশলী আশরাফুজ্জামানও।
মামলা দায়েরের পর দুদকের পক্ষ থেকে আসামিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ তা অমান্য করে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রেখেছে, যা নিয়ে সংস্থাটির ভেতরে ও বাইরে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে বর্তমান সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েও।






















