আশিক ইসলাম ▪️ দুবাই থেকে: মঞ্চের ঠিক মাঝখানে রাখা সোনালি ট্রফিটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন আট দেশের আট অধিনায়ক। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে ঝলমল করছিল দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মঞ্চ। ভিড়ের মধ্যে একটু আলাদা করেই চোখে পড়ল লাল-সবুজ জার্সি গায়ে দাঁড়ানো এক মুখ নিগার সুলতানা জ্যোতি। ভঙ্গিতে জড়তা নেই, বরং স্পষ্ট এক প্রত্যয় এবার বাংলাদেশ দুবাইয়ে এসেছে খালি হাতে ফিরতে নয়।
বৃহস্পতিবার এই মঞ্চ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত হলো ডিপি ওয়ার্ল্ড উইমেন্স টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপ ২০২৬-এর ট্রফি। এরপর একে একে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন অংশগ্রহণকারী আট দলের অধিনায়ক, চলল সংবাদ সম্মেলন আর ছবি তোলার পালা। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে যে বার্তাটা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল, তা হলো এশিয়ার নারী ক্রিকেটে এখন আর কেউ নিছক অংশগ্রহণের জন্য মাঠে নামছে না। প্রত্যেকেই এসেছে জেতার জন্য।
আট বছর আগের এক রাতের ছায়া
বাংলাদেশের জন্য এই গল্পটা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৮ সালের সেই রাতটা এখনো ভোলেননি এ দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা যেদিন সালমা খাতুনের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো এশিয়া সেরার মুকুট উঠেছিল বাংলাদেশের মাথায়। আট বছর পেরিয়ে গেছে তারপর। প্রজন্ম বদলেছে, নেতৃত্ব বদলেছে, কিন্তু স্বপ্নটা রয়ে গেছে একই জায়গায়।
এবারের দলটা অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের এক অদ্ভুত সুন্দর মিশেল। মাঠের বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায়, দলের ভেতরে একটা স্থিরতা তৈরি হয়েছে যা গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের ফসল। আর এই স্থিরতাই যেন জ্যোতির কণ্ঠে সেদিন ধরা পড়ল আত্মবিশ্বাস হয়ে।
২৮ আগস্ট থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর দুবাইয়েই সব লড়াই
আগামী ২৮ আগস্ট মাঠে গড়াবে টুর্নামেন্ট, শেষ হবে ১৩ সেপ্টেম্বর ফাইনালের মধ্য দিয়ে। বিশেষত্ব হলো, গ্রুপ পর্ব থেকে ফাইনাল পর্যন্ত প্রতিটি ম্যাচ, দুটি সেমিফাইনাল এমনকি ফাইনালও হবে একই ভেন্যুতে, দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। অর্থাৎ পুরো টুর্নামেন্টের গল্পটা লেখা হবে একটাই মাঠে, একটাই আকাশের নিচে।
আট দলকে ভাগ করা হয়েছে দুই গ্রুপে। বাংলাদেশ পড়েছে ‘বি’ গ্রুপে, প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়া। প্রতিটি গ্রুপ থেকে সেরা দুই দল পা রাখবে সেমিফাইনালে যেখানে লড়াইটা হবে আরও কঠিন, আরও স্নায়ুক্ষয়ী।
বাংলাদেশের সূচি এমন—
* ৩১ আগস্ট, সোমবার: বাংলাদেশ–ইন্দোনেশিয়া, রাত ৮টা (ইউএই সময়)
* ৪ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার: বাংলাদেশ–শ্রীলঙ্কা, রাত ৮টা
* ৮ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার: বাংলাদেশ–সংযুক্ত আরব আমিরাত, রাত ৮টা
সেমিফাইনাল ১১ সেপ্টেম্বর, আর মহারণ ফাইনাল ১৩ সেপ্টেম্বর।
মাইক্রোফোনের সামনে একসুর, মনে মনে আলাদা প্রতিজ্ঞা
সংবাদ সম্মেলনে একে একে কথা বললেন আট অধিনায়ক। প্রায় প্রত্যেকের কথাতেই ঘুরেফিরে এলো একই প্রসঙ্গ এশিয়ায় নারী ক্রিকেট কতটা এগিয়েছে, প্রতিযোগিতার মান কতটা বেড়েছে, দর্শকের আগ্রহ কীভাবে বাড়ছে বছরের পর বছর। শুনে মনে হলো, সবাই যেন একই গল্প বলছেন কিন্তু প্রত্যেকের চোখেই ছিল নিজের দলকে নিয়ে আলাদা এক স্বপ্ন, আলাদা এক প্রতিজ্ঞা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটটা অবশ্য একটু ভিন্ন খাতে বওয়া। শুধু কথায় নয়, মাঠের পারফরম্যান্সেও গত কয়েক বছরে যে উন্নতির ছাপ পড়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। জ্যোতির অভিজ্ঞ নেতৃত্ব, দলের ভেতরকার বোঝাপড়া, আর তরুণদের নির্ভীক ক্রিকেট এই তিনের মিশেলেই তৈরি হয়েছে একটা বিশ্বাসযোগ্য সম্ভাবনা। পরিকল্পনামতো খেলতে পারলে ২০১৮-এর সেই গল্পটা আবারও লেখা অসম্ভব কিছু নয়।
অপেক্ষার প্রহর গোনা শুরু
আর মাত্র কয়েকদিন। ২৮ আগস্ট বেজে উঠবে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী বাঁশি, তবে বাংলাদেশের কোটি সমর্থকের চোখ থাকবে মূলত ৩১ আগস্টের দিকে। সেদিনই ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে মাঠে নেমে নতুন এক অভিযানের সূচনা করবে টাইগ্রেসরা। দুবাইয়ের গ্যালারি থেকে দেশের অলিগলির টিভি পর্দা পর্যন্ত সবার প্রত্যাশা একটাই জায়গায় গিয়ে মিশছে: আরেকবার এশিয়ার মুকুট উঠুক লাল-সবুজের মাথায়।
মঞ্চ প্রস্তুত। ট্রফি রাখা আছে আলোর নিচে। এখন শুধু অপেক্ষা মাঠের লড়াই শুরুর।























