২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্দেশ্যে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুটি বেঞ্চ এ পর্যন্ত সংবেদনশীল ৬টি মামলার রায় ঘোষণা করেছে। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে জানান, শহীদ ও আহতদের বিচারের যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠিত হয়েছিল, তা এই দৃষ্টান্তমূলক রায়ের মাধ্যমে অনেকাংশে পূরণ হয়েছে। দেশের অন্য যেকোনো আদালতের চেয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এসব স্পর্শকাতর মামলার নিষ্পত্তি করা হয়েছে এবং অন্যান্য মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে।
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড: ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেন। একইসাথে সাজাপ্রাপ্তদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং শহীদদের পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
চানখাঁরপুলে ৬ শিক্ষার্থী হত্যা: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণে ৬ জন নিহত হন। এ ঘটনায় ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও সাবেক এডিসি শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এছাড়া সাবেক এসি মোহাম্মদ ইমরুলকে ৬ বছর, সাবেক ওসি আরশেদ হোসেনকে ৪ বছর এবং ৩ জন কনস্টেবলকে ৩ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর ঘটনা: ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, ওসি এএফএম সায়েদ রনিসহ ৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলামসহ ৭ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এছাড়া ২ আসামিকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং রাজসাক্ষী শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা ঘোষণা করা হয়।
আবু সাঈদ হত্যা মামলা: রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল-২ সাবেক এএসআই মো. আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড এবং ৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। একইসাথে বেরোবির সাবেক ভিসি, প্রক্টর, স্বাচিপ নেতাসহ ২৫ জন আসামিকে ৩ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি: রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি ও দুজনকে হত্যার ঘটনায় ২০২৬ সালের ২৮ জুন ট্রাইব্যুনাল-১ সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড, সাবেক এসআই তারিকুল ইসলামকে যাবজ্জীবন এবং গ্রেফতারকৃত সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেন।
হাসানুল হক ইনুর কারাদণ্ড: কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথোপকথনে ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’র দায়ে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন ট্রাইব্যুনাল-২ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেন।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২৬ মে চানখাঁরপুলের ঘটনাটির আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেওয়ার মাধ্যমেই এই ঐতিহাসিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। বর্তমানে দুটি ট্রাইব্যুনালেই আওয়ামী লীগ শাসনামলের গুম-খুনসহ গণঅভ্যুত্থানের অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।



















