জাকির পাটোয়ারী: বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানিকৃত বিপুল পরিমাণের কাঁচামাল খোলা বাজারে অবৈধভাবে বিক্রি করে সরকারের প্রায় ৫৮৫ কোটি ৩২ লক্ষ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়েছে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (সিইপিজেড) শতভাগ রপ্তানিকৃত পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান মেসার্স জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেড। কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রামের সিইপিজেড ডিভিশনের এক বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে।
বর্তমানে কারখানাটি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে এবং বন্ডের কোনো নিয়ম না মেনে এর গুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ আমদানি করা ফেব্রিক্স ও এক্সেসরিজ অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের নিরীক্ষাকারী দল চলতি বছরের গত ৫ জুলাই সিইপিজেডের সেক্টর-০৬ এ অবস্থিত জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেড কারখানাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির গুদামে ৩টি ক্যাটাগরিতে মোট ১ কোটি ৩৯ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৯ কেজি কাঁচামাল মজুদ থাকার কথা ছিল। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গুদামে মাত্র ২ লাখ ৮২ হাজার ৮০৮ কেজি কাঁচামাল রয়েছে। বাকি ১ কোটি ৩৬ লাখ ৯৬ হাজার ৮১১ কেজি কাঁচামাল কাস্টমসের অনুমতি ছাড়াই কারখানা থেকে অবৈধভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, গায়েব হওয়া কাঁচামালের মধ্যে গুদাম থেকে ৮৭ লক্ষ ৫৩ হাজার ৫৪৭ কেজি কাপড় গায়েব করা হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার এবং ফাঁকি দেওয়া শুল্কের পরিমাণ ৪৮২ কোটি ৫২ লাখ ১২ হাজার ৮৮৪ টাকা।
গায়েব হয়েছে ৫১ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫ কেজি এক্সেসরিজ, যার মূল্য ৭৪ লাখ মার্কিন ডলার এবং ফাঁকিকৃত শুল্ক ১০১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৮ হাজার ২৪৬ টাকা।
এছাড়া প্যাকিং মেটেরিয়ালস ৬৭ হাজার ৬ কেজি গায়েব করা হয়েছে, যার শুল্ক ফাঁকি ৮২ লাখ ৬৬ হাজার ২৬০ টাকা।
সর্বমোট অবৈধভাবে অপসারিত কাঁচামাল ১,৩৯,৭৯,৬১৯ কেজি। যেখানে ফাঁকি দেওয়া শুল্ক-কর: ৫৮৫,৩২,১৭, ৩৯১.৪২ টাকা (পাঁচশত পঁচাশি কোটি বত্রিশ লক্ষ সতেরো হাজার তিনশত একানব্বই টাকা বিয়াল্লিশ পয়সা)।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, রপ্তানি করতে ব্যর্থ হওয়া এবং ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ না করার কারণে প্রতিষ্ঠানটির নামে লিয়েন ব্যাংক- এক্সিম ব্যাংক লিঃ (EXIM Bank Ltd.) থেকে ১১৭ কোটি ৯৩ লাখ ৯৬ হাজার ৬৬২.২৭ টাকা মূল্যের ‘ফোর্সড লোন’ বা বাধ্যতামূলক ঋণ তৈরি করা হয়েছে। বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ধরনের আর্থিক অনিয়ম দেশের ব্যাংক খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রতিষ্ঠানটি এর আগে অবৈধ অপসারণের দায়ে কাস্টমসের দায়ের করা ৩৫ লাখ ৪০ হাজার ৭১৯ টাকার একটি শুল্ক ফাঁকির মামলা হেরে গিয়ে টাকা জমা দিলেও সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে কাস্টমস আপিল দায়ের করে রেখেছে, যা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ধারা ২০২ অনুযায়ী, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এই পাওনা আদায়ে তাদের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা বা সম্পদ ক্রোকের ক্ষমতা রাখে। কিন্তু এমন কোন পদক্ষেপ এখনও নেয়া হয়নি।
কাগজপত্র অনুযায়ী, এই বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মিসেস হুমায়ারা শামস (স্বামী: মৃত মাহমুদ আলী) এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব মুস্তাফা মাহমুদ (পিতা: মৃত মাহমুদ আলী)। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে মিঃ স্টেফিন ভুজিংক এবং মিসেস নাগাই ফুং চান নামে দুজন বিদেশি পরিচালকও রয়েছেন। ২০২৫ সালের ১৯ মে কারখানাটি অফিশিয়ালি ‘লে-অফ’ বা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই মূলত এই বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল অবৈধভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
এই জালিয়াতি ও শুল্ক ফাঁকির ঘটনায় কাস্টমসের নিরীক্ষক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা প্রবীর নাথ, রাজস্ব কর্মকর্তা সারোয়ার আলম এবং জয়েন্ট কমিশনার অনুপম চাকমার স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অবিলম্বে কারণ দর্শানো নোটিশ জারির মাধ্যমে এই ৫৮৫ কোটি টাকার বিশাল সরকারি রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু করতেও বলা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে যারা দেশের দেশীয় টেক্সটাইল শিল্প এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে এই তদন্ত প্রতিবেদন একটি বড় ধরনের আইনি পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে।























