চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প ঘিরে জনদুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে। কোথাও পুরোনো পিচ তুলে ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও বৃষ্টির পানিতে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। আবার রোদ উঠলেই সড়কজুড়ে উড়ছে ধুলাবালি। কাজের ধীরগতি, অব্যবস্থাপনা ও পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দা, যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে। গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে চলাচল করতে গিয়ে প্রতিদিনই চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৪৮১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩১ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের মে মাসে। প্রকল্পের আওতায় বিপজ্জনক বাঁক সরলীকরণ, বাজার এলাকায় চার লেন সড়ক নির্মাণ এবং নতুন কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
শুরুতে কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক থাকলেও বর্তমানে ধীরগতির কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও দেড় বছর বাড়ানোর আবেদন করেছে সওজ।
পিচ তুলে ফেলে রাখায় দুর্ভোগে যাতায়াতকারী অসহায় মানুষ।
সম্প্রতি শিবগঞ্জ উপজেলার ছত্রাজিতপুরের ফুলতলা থেকে বহলাবাড়ি, বোর্ডঘর মোড় থেকে হরিনগর কালভার্ট এলাকা পর্যন্ত কাজ শুরু করলেও তা চলছে ঢিমেতালে। এবং ধোবড়া বাজার থেকে সোনামসজিদ স্থলবন্দরের দিকে মহাসড়কের কয়েকটি অংশের পুরোনো পিচ তুলে ফেলে রাখা হয়েছে। এসব স্থানে পর্যাপ্ত সংস্কার ও ধুলা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় সড়কটি কোথাও কর্দমাক্ত, কোথাও ধুলায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।
বর্ষা শেষ হলেও বৃষ্টির পানি জমে তৈরি হয়েছে খানাখন্দ। বৃষ্টি থামলে শুকনো সড়কে যানবাহন চলাচলের সঙ্গে সঙ্গে ধুলাবালি ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশে। এতে পথচারী, যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি সড়কের বিভিন্ন অংশে যানবাহনের গতি কমে যাওয়ায় যানজটও বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উন্নয়নকাজের নামে দীর্ঘ সময় ধরে সড়কের বিভিন্ন অংশ খুঁড়ে ফেলে রাখায় ও ঢিমেতালে কাজ করায়, দুর্ভোগ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। কাজের ধারাবাহিকতা ও যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এমন পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতো।
যানবাহনের ক্ষতি, বাড়ছে চালকদের লোকসান
এই মহাসড়কে নিয়মিত চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক হাসান আলী বলেন, শুরুতে কাজের গতি ভালো থাকলেও এখন একদিন যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ করার পর তিন দিন পর্যন্ত বন্ধ থাকতে দেখা যায়। ভাঙাচোরা সড়কে চলাচল করতে গিয়ে গাড়ির টায়ার ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। এতে প্রতিদিনই বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে চালকদের।
তিনি বলেন, যাত্রী পরিবহন করে যে আয় হয়, তার বড় একটি অংশ গাড়ির মেরামত ও যন্ত্রাংশ কেনার পেছনে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত সড়ক সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করা না হলে চালকদের আর্থিক ক্ষতি আরও বাড়বে।
অসুস্থ ও নবজাতক নিয়ে চলাচলে ভোগান্তি
সড়কের দুরবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ ব্যক্তি ও গর্ভবতী নারীরা। সম্প্রতি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের দুই মাস পর সন্তানকে নিয়ে জেলা হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে যাওয়ার সময় দুর্ভোগের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন গৃহিণী তানিয়া খাতুন।
তিনি জানান, ভাঙাচোরা সড়কে গাড়ি চলার সময় প্রতিটি ঝাঁকুনিতে অস্ত্রোপচারের সেলাইয়ের জায়গায় টান লাগার আশঙ্কা হয়। ধুলাবালির কারণে শিশুকে নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। তাঁর দাবি, পুরো সড়ক একসঙ্গে খুঁড়ে ফেলে না রেখে পর্যায়ক্রমে কাজ করা হলে মানুষের ভোগান্তি কমত এবং যান চলাচলও স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হতো।
সীমান্ত বাণিজ্যেও পড়ছে প্রভাব
সোনামসজিদ স্থলবন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর হওয়ায় এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করে। সড়কের বেহাল অবস্থায় পণ্য পরিবহনেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চালকেরা।
পণ্যবাহী ট্রাকচালক রুবেল আলী বলেন, পিচ তুলে ফেলা অংশে বৃষ্টির পর কাদামাটি তৈরি হচ্ছে।
ভারী ট্রাক চলাচলের সময় কোথাও কোথাও চাকা দেবে যাচ্ছে। আবার রোদ উঠলে ধুলাবালিতে সামনের রাস্তা স্পষ্ট দেখা যায় না। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে সময়ও বেশি লাগছে।
সড়কের এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে স্থলবন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহন ও সীমান্ত বাণিজ্যের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ধুলা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
নির্মাণকাজ চলাকালে ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, সড়কে পানি ছিটানোসহ ধুলা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়মিতভাবে নেওয়া হচ্ছে না। ফলে আশপাশের বসতবাড়ি, দোকানপাট ও পথচারীরা ধুলাদূষণের শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয়দের মতে, সড়ক প্রশস্তকরণ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প। তবে উন্নয়নের কাজ করতে গিয়ে জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক যাতায়াতের বিষয়গুলো উপেক্ষা করা উচিত নয়। কাজের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি নির্মাণস্থলে নিয়মিত পানি ছিটানো, খানাখন্দ দ্রুত ভরাট এবং ঝুঁকিপূর্ণ অংশে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সওজের বক্তব্য
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সওজ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রায়হান ইমতিয়াজ জানান, বর্ষা মৌসুমের কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় গত ১৭ জুন থেকে সড়কের পিচ কার্পেটিংয়ের কাজ বন্ধ রাখা হলেও সম্প্রতি কাজ শুরু হয়েছে। আগে পিচ তুলে ফেলা অংশগুলোতে আপাতত পাথর বিছিয়ে রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, বৃষ্টির পানি জমে কোথাও খানাখন্দ সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিকভাবে ভরাট করার নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর সড়কে পানি ছিটানোর স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য
প্রকল্পের কাজের দায়িত্বে থাকা রাজশাহীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডন এন্টারপ্রাইজের সুপারভাইজার মো. মামুন বলেন, তাঁরা প্রকল্পের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা অনুসরণ করেই কাজ করছেন। তবে কয়েক দিন ধরে তিনি সংশ্লিষ্ট এলাকায় যাননি। এ কারণে ওই এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর বিস্তারিত জানা নেই।
দ্রুত সমাধান চান ভুক্তভোগীরা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে সোনামসজিদ স্থলবন্দর পর্যন্ত এই মহাসড়কটি স্থানীয় মানুষের যাতায়াত, পণ্য পরিবহন ও সীমান্ত বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই উন্নয়নকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি জনদুর্ভোগ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত তদারকি জোরদার করবে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজের গতি বাড়াবে এবং ধুলাবালি ও খানাখন্দ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত কাজ সম্পন্ন করার পাশাপাশি মানুষের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করাই এখন এলাকাবাসীর প্রধান দাবি।






















