আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস রেটিংস বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস (আউটলুক) ‘নেগেটিভ’ থেকে ‘স্টেবল’ (স্থিতিশীল) করেছে। সংস্থাটির মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ পরিবর্তনের কথা জানানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এই মূল্যায়নকে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এই মূল্যায়নের ফলে বাংলাদেশের সামশক্তিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ার পাশাপাশি দেশের ঋণ গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
মুডিসের এই মূল্যায়নে দেশের বৈদেশিক খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ দিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়, যা চার মাসের বেশি সময়কালের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত। রেমিট্যান্স প্রবাহে রেকর্ড বৃদ্ধি, ব্যাংকিং চ্যানেল সুসংহত হওয়া এবং তুলনামূলক নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থার কারণে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। সম্প্রতি এই রিজার্ভ আরও বেড়ে ৩৬ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড প্রবাসী আয় এসেছে এবং ব্যালান্স অব পেমেন্টসের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে।
রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতাকেও আউটলুক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে মুডিস। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমেছে এবং নির্বাচিত সরকারের শক্তিশালী জনসমর্থনের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চলমান সম্পৃক্ততা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ, আমানত সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমাধানের পরিকল্পনা এবং সাবেক মালিকদের পুনর্নিয়োগসংক্রান্ত বিধান বাতিলের মতো উদ্যোগগুলোও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পেয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশের বড় ও বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি, অনুকূল জনমিতিক সুবিধা এবং প্রতিযোগিতামূলক তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের শক্তিশালী অবস্থানকে অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ব্যাংক খাতকে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে এক্সিট পলিসি, বন্ধ কারখানা চালু, ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’ প্রণয়ন ও অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ক্যাশলেস বাংলা কিউআর ও সাপ্লাই-চেইন ফাইন্যান্স সুবিধা চালুর মাধ্যমে বাণিজ্য আরও সহজ করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এই স্থিতিশীল আউটলুক দেশের সার্বভৌম ঋণমান ভবিষ্যতে আরও উন্নত করতে ভূমিকা রাখবে।























