মাসিক সর্বসাকুল্যে বেতন মাত্র ৫৪ হাজার টাকা। কিন্তু জীবনযাপন যেন কোনো অভিজাত ধনকুবেরের মতো! রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট, দিনাজপুর ও রংপুরে বিস্তীর্ণ জমি, দোকান এবং গোডাউনসহ শতকোটি টাকার বিপুল স্থাবর সম্পদের মালিক বনে গেছেন দিনাজপুর সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহনুর রশিদ। তাঁর এই আকাশচুম্বী সম্পদবৃদ্ধির অসঙ্গতি নিয়ে এবার মাঠ নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ক্ষমতার অপব্যবহার, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, দরপত্রে অনিয়ম এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নামে-বেনামে এই সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে সংস্থাটি। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও আর্থিক অসঙ্গতির চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।
অনুসন্ধানের নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে শাহনুর রশিদের সম্পদের পরিধি। ঐ বছরের ২৪ আগস্ট বিরামপুরে দুটি দোকান ও একটি গোডাউন এবং ১০ অক্টোবর ৩ শতাংশ জমি ক্রয় করেন তিনি। এরপর ২০১১ সালে দিনাজপুরের বাঁশবাড়িয়া মৌজায় ৫১.৫০ শতাংশ এবং বিরামপুরে ৭.৫০ শতাংশ জমি কেনেন। ২০১৩ সালে বাঁশবাড়িয়া মৌজায় আরও ৩৩ শতাংশ জমি যুক্ত হয় তাঁর ঝুলিতে। ২০১৮ ও ২০২০ সালে রংপুরের সাতগাড়া মৌজায় দু’টি মূল্যবান প্লট কেনেন। ২০২১ সালে বিরামপুর ও কানিকাঠাল মৌজায় দফায় দফায় বিপুল পরিমাণ জমি কেনেন, যার মধ্যে শুধু কানিকাঠাল মৌজায় দুই দলিলেই কেনেন প্রায় ১৮৯ শতাংশ জমি। ফ্ল্যাটের নেশা দানা বাঁধে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে; যথাক্রমে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের উত্তর মেরাদিয়া এবং পল্লবীর বাউনিয়া এলাকায় দুটি বিলাসবহুল আবাসিক ফ্ল্যাট কেনেন তিনি।
কাগজে-কলমে এই বিপুল সম্পদের উৎস হিসেবে আয়কর নথিতে চাকরির বেতন, কৃষি আয় এবং দোকান ভাড়াকে দেখানো হলেও, ঘোষিত আয়ের সঙ্গে বাস্তব সম্পদের পরিমাণের আকাশ-পাতাল ব্যবধান দেখছেন তদন্তকারীরা। অভিযোগ রয়েছে, দিনাজপুর সওজের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে পিপিআর লঙ্ঘন করে দরপত্রের শর্ত তৈরি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে ছাড় দেওয়া এবং পুলহাট থেকে খানপুর পর্যন্ত সড়কের অবৈধ স্থাপনা থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন তিনি। এমনকি দুদকের টের পেয়ে সম্পদ জব্দের আশঙ্কায় ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা উত্তোলন করে নিজের ও আত্মীয়দের কাছে সরিয়ে ফেলেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
দুদকের প্রধান কার্যালয়ে দায়ের করা লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে বর্তমানে দিনাজপুর জেলা কার্যালয় এই অনুসন্ধানের দায়িত্ব পালন করছে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ইতিমধ্যে নোটিশও পাঠানো হয়েছে। দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত অসঙ্গতির তথ্যগুলো গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত এই বিপুল সম্পদের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ‘দৈনিক জাতীয় খবর’-এর পক্ষ থেকে সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহনুর রশিদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, পত্রিকার পরিচয় পেয়েই তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং পরবর্তীতে একাধিকবার চেষ্টা করলেও আর ফোন রিসিভ করেননি।






















