ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের চার দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিতদের উদ্ধারের আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। লা গুয়াইরা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, বুধবার সন্ধ্যায় ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার পরপর দুটি ভূমিকম্পে দেশটিতে অন্তত ১,৪৫০ জন নিহত এবং ৩,১৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। দেশটির জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট হোর্হে রড্রিগেজ জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে ৭৭৪টি ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৮৯টি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। উদ্ধারকাজের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এখনো কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এটি ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্পে পরিণত হয়েছে এবং জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার মতে, এই দুর্যোগে সর্বোচ্চ প্রায় ৬৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ভেনেজুয়েলায় এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ এক নতুন বিপর্যয় ডেকে এনেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশটির হাসপাতাল ও জনসেবামূলক ব্যবস্থা এমনিতেই ভেঙে পড়েছিল। এর ওপর জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পে দেশটির ভৌত অবকাঠামোর প্রায় ৬.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা ভেনেজুয়েলার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ছয় শতাংশের সমান। বর্তমানে দেশটির কয়েক মিলিয়ন মানুষ স্যানিটেশনসহ মৌলিক নানা সেবার বাইরে রয়েছেন।
ভয়াবহ এই পরিস্থিতির মধ্যেও কারাকাস থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তরের কারাবালেদা শহরে ফরাসি ও মার্কিন উদ্ধারকারী দল এক ব্যক্তি ও তার কিশোর ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। তবে সব জায়গায় চিত্রটি এত আশাব্যঞ্জক নয়। উপকূলীয় শহর তুকাকাস ও লা গুয়াইরার মতো এলাকায় উদ্ধারকর্মীরা দিনরাত চেষ্টা চালালেও অধিকাংশ সময় কেবল মরদেহ উদ্ধার করছেন। উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ২৭ বছর বয়সী লুইস সালাস জানান, ধ্বংসস্তূপ ও সুড়ঙ্গ পেরিয়ে নিখোঁজদের কাছে পৌঁছানোর পর তাদের মৃত অবস্থায় পাওয়াটা ছিল সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত। অন্যদিকে, কারাকাসের সান বার্নারদিনো এলাকায় স্বেচ্ছাসেবীরা ড্রিল মেশিন ও হাতে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ করছেন এবং চাকাওয়ে এলাকার বড় বড় ইলেকট্রনিক পর্দায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন করা হচ্ছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের ধীরগতি ও অপ্রতুল সহায়তার কারণে উপদ্রুত এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ বাড়ছে। লা গুয়াইরা ও তুকাকাসের স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সময়মতো তল্লাশি চালানো হলে আরও অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো। ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা সেনাবাহিনীকে অস্ত্র নামিয়ে উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এরই মধ্যে লা গুয়াইরা শহরে চরম বিশৃঙ্খলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ফার্মেসি ও সুপারমার্কেটসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালানো হয়। স্বজনহারা অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া পরিবারের সদস্যদের বের করার মতো প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন না।
এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেজ জানিয়েছেন, যাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে তাদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়শিবির নির্মাণ করা হচ্ছে এবং খুব অল্প সময়ে নতুন বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। উদ্ধারকর্মীদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এখনো জীবিত মানুষ উদ্ধার হওয়ার আশা তারা ছেড়ে দেননি। তিনি আরও জানান, ২৪টি দেশ থেকে ইতোমধ্যে ৫২১ টন ত্রাণসামগ্রী এসেছে এবং উদ্ধারকাজে ২,৭০০ জনের বেশি কর্মী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরের ৮৬টি ইউনিট নিয়োজিত রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে কারাকাসে এক সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর, যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে দেশটিতে ২৫০ সদস্যের একটি দুর্যোগ মোকাবিলা দল পাঠিয়েছে। মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড জানিয়েছে, হেলিকপ্টারে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানোর পাশাপাশি বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর পুনরায় চালু করতে আরও ২৩০ জন মার্কিন সামরিক সদস্য সহায়তার জন্য আসছেন। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক সংকটের মাঝে আন্তর্জাতিক সহায়তায় উদ্ধার অভিযান চললেও সময় গড়ানোর সাথে সাথে নিখোঁজদের জীবিত পাওয়ার সম্ভাবনা মিলিয়ে যাচ্ছে।






















