০১:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পানি কমলেও কাটেনি তিস্তাপাড়ের কান্না

  • আপডেট সময় : ০৪:১৩:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
  • 206

পানি কমলেও কাটেনি তিস্তাপাড়ের কান্না

উত্তরের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি ওঠানামার ফলে রংপুর অঞ্চলের সামগ্রিক বন্যা ও ভাঙন পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার এবং কাউনিয়া পয়েন্টে ২৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী—এই ৫ জেলার নদী তীরবর্তী এলাকার অন্তত ২০ হাজার পরিবার বর্তমানে পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা। পানি কমতে শুরু করার সাথে সাথেই তীব্র নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে, যার ফলে গত দু’দিনে এই অঞ্চলে ৬৫টি পরিবার ভাঙনের শিকার হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে আগামী কয়েকদিন ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় তিস্তার পানি আবারও বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এই নতুন আশঙ্কায় চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।

নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় যোগাযোগ অবকাঠামো ও কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতি ও চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা সেতু রক্ষাবাঁধ ও ডানতীর সংরক্ষণে নির্মিত গ্রোয়েন এলাকায় ভাঙন দেখা দেওয়ার পাশাপাশি কোলকোন্দ ও লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে মহিপুর এলাকায় নির্মিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু’র সংযোগ সড়কের অন্তত ১৫টি স্থানে বড় বড় গর্ত ও ফাটল সৃষ্টি হওয়ায় যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছর ভাঙনের পর কোনো স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না নিয়ে মাত্র ছয় মাস আগে ১৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে অস্থায়ী বাঁশের পাইলিং করা হয়েছিল, যা চলতি বর্ষার প্রথম ধাপের তীব্র স্রোতেই ধসে গেছে। ফলে ইতোমধ্যে প্রায় ১৫০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এবং দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুসহ রংপুর-কাকিনা আঞ্চলিক সড়ক ও আশপাশের মানুষের বসতভিটা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মতে, সময়মতো জিও ব্যাগ না ফেলার কারণে এবং অপরিকল্পিত অস্থায়ী কাজের জন্য সরকারের এই বিপুল অর্থ অপচয় হয়েছে। এছাড়া কুড়িগ্রামের উলিপুর ও নাগেশ্বরীতে তিস্তার তীব্র স্রোতে ২০০ মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে।

ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্গত এলাকার সাধারণ মানুষ চরম খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও গবাদি পশুর খাদ্য সংকটে ভুগছেন। শত শত বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক এখন হাঁটু পানির নিচে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষেরা এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ না পাওয়ার ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যার পানিতে প্রায় ৩২০ হেক্টর আমন ধান, ৮ হেক্টর মাসকলাই, ৮৬০ হেক্টর বীজবাদাম এবং ৭৯০ হেক্টর সবজির জমি তলিয়ে গেছে, যা কৃষকদের নিঃস্ব হওয়ার পথে ঠেলে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় না থেকে গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়াইবাড়ি খেয়াঘাট এলাকায় ১২ হাজার পরিবারের বসতভিটা রক্ষায় দিনমজুর, কৃষক ও চরাঞ্চলের মানুষ নিজেদের শ্রম ও চাঁদার টাকায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মাটির স্বেচ্ছাসেবামূলক বাঁধ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু উজানের ঢলে এখন সেই বাঁধটিতেও ভাঙন দেখা দেওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। নদীপাড়ের জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন যে রাতের বেলা হঠাৎ পানি বাড়ার কারণে মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না। এই পরিস্থিতিতে শুধু সাময়িক ত্রাণ বিতরণ নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী মানুষেরা। প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং দ্রুত সহায়তা কার্যক্রম শুরু করতে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে বলে নিশ্চিত করেছেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার ও স্থানীয় প্রকৌশলীবৃন্দ।

3 November 2026

পানি কমলেও কাটেনি তিস্তাপাড়ের কান্না

Spread the love
জনপ্রিয়
গ্রামীণফোনের ৯ মাসের মুনাফায় পতন, তৃতীয় প্রান্তিকে আয় অপরিবর্তিত
গ্রামীণফোনের ৯ মাসের মুনাফায় পতন, তৃতীয় প্রান্তিকে আয় অপরিবর্তিত

টানবাজারে বন্ডের কেমিক্যাল কালোবাজারি: গুদাম সিলগালা, জব্দ ৮১.৬ টন

পানি কমলেও কাটেনি তিস্তাপাড়ের কান্না

আপডেট সময় : ০৪:১৩:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

উত্তরের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি ওঠানামার ফলে রংপুর অঞ্চলের সামগ্রিক বন্যা ও ভাঙন পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার এবং কাউনিয়া পয়েন্টে ২৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী—এই ৫ জেলার নদী তীরবর্তী এলাকার অন্তত ২০ হাজার পরিবার বর্তমানে পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা। পানি কমতে শুরু করার সাথে সাথেই তীব্র নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে, যার ফলে গত দু’দিনে এই অঞ্চলে ৬৫টি পরিবার ভাঙনের শিকার হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে আগামী কয়েকদিন ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় তিস্তার পানি আবারও বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এই নতুন আশঙ্কায় চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।

নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় যোগাযোগ অবকাঠামো ও কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতি ও চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা সেতু রক্ষাবাঁধ ও ডানতীর সংরক্ষণে নির্মিত গ্রোয়েন এলাকায় ভাঙন দেখা দেওয়ার পাশাপাশি কোলকোন্দ ও লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে মহিপুর এলাকায় নির্মিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু’র সংযোগ সড়কের অন্তত ১৫টি স্থানে বড় বড় গর্ত ও ফাটল সৃষ্টি হওয়ায় যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছর ভাঙনের পর কোনো স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না নিয়ে মাত্র ছয় মাস আগে ১৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে অস্থায়ী বাঁশের পাইলিং করা হয়েছিল, যা চলতি বর্ষার প্রথম ধাপের তীব্র স্রোতেই ধসে গেছে। ফলে ইতোমধ্যে প্রায় ১৫০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এবং দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুসহ রংপুর-কাকিনা আঞ্চলিক সড়ক ও আশপাশের মানুষের বসতভিটা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মতে, সময়মতো জিও ব্যাগ না ফেলার কারণে এবং অপরিকল্পিত অস্থায়ী কাজের জন্য সরকারের এই বিপুল অর্থ অপচয় হয়েছে। এছাড়া কুড়িগ্রামের উলিপুর ও নাগেশ্বরীতে তিস্তার তীব্র স্রোতে ২০০ মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে।

ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্গত এলাকার সাধারণ মানুষ চরম খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও গবাদি পশুর খাদ্য সংকটে ভুগছেন। শত শত বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক এখন হাঁটু পানির নিচে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষেরা এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ না পাওয়ার ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যার পানিতে প্রায় ৩২০ হেক্টর আমন ধান, ৮ হেক্টর মাসকলাই, ৮৬০ হেক্টর বীজবাদাম এবং ৭৯০ হেক্টর সবজির জমি তলিয়ে গেছে, যা কৃষকদের নিঃস্ব হওয়ার পথে ঠেলে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় না থেকে গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়াইবাড়ি খেয়াঘাট এলাকায় ১২ হাজার পরিবারের বসতভিটা রক্ষায় দিনমজুর, কৃষক ও চরাঞ্চলের মানুষ নিজেদের শ্রম ও চাঁদার টাকায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মাটির স্বেচ্ছাসেবামূলক বাঁধ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু উজানের ঢলে এখন সেই বাঁধটিতেও ভাঙন দেখা দেওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। নদীপাড়ের জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন যে রাতের বেলা হঠাৎ পানি বাড়ার কারণে মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না। এই পরিস্থিতিতে শুধু সাময়িক ত্রাণ বিতরণ নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী মানুষেরা। প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং দ্রুত সহায়তা কার্যক্রম শুরু করতে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে বলে নিশ্চিত করেছেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার ও স্থানীয় প্রকৌশলীবৃন্দ।

3 November 2026

পানি কমলেও কাটেনি তিস্তাপাড়ের কান্না

Spread the love