যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেন পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদারের লক্ষ্যে পোল্যান্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী গদানস্কে বৃহস্পতিবার থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন শুরু হচ্ছে। রাশিয়ার হামলার ফলে সৃষ্ট বিশাল ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ইউক্রেনের প্রায় ৫৮৮ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন—যা সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই বিপুল অর্থায়নের জন্য ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন দেশকে উৎসাহিত করাই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য। তবে পোল্যান্ড ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক বিরোধের কারণে এবারের সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন না ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে জেলেনস্কি নিজে ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিলেও, এবার দেশটির প্রতিনিধিত্ব করছেন প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া সিভরদেঙ্কো।
পোল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কির সঙ্গে জেলেনস্কির সাম্প্রতিক বিরোধ এই অনুপস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৪৩-১৯৪৫) তৎকালীন পোল্যান্ডের অংশ ভলিনিয়া অঞ্চলে কয়েক হাজার পোলিশ বেসামরিক মানুষকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ‘ইউক্রেনীয় বিদ্রোহী সেনাবাহিনী’ (ইউপিএ)-র নামে ইউক্রেন একটি সামরিক ইউনিটের নামকরণ করায় ক্ষুব্ধ হন নাভরোৎস্কি। এর জেরে তিনি ইউক্রেনীয় নেতাকে দেওয়া একটি রাষ্ট্রীয় সম্মাননাও প্রত্যাহার করে নেন। যদিও ইউক্রেনের অনেকে ইউপিএকে নাৎসি ও সোভিয়েত বিরোধী লড়াইয়ের জন্য শ্রদ্ধার চোখে দেখে, তবে এই ঐতিহাসিক বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরেই দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে ছায়া ফেলেছে। কিয়েভের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জর্জি তিখি অবশ্য আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই ‘অপ্রয়োজনীয় রাজনীতিকরণ’ এড়িয়ে সম্মেলনটি বাস্তবধর্মী ও কার্যকর সিদ্ধান্তের দিকেই মনোনিবেশ করবে। অন্যদিকে, পোল্যান্ডের ইউরোপপন্থী প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও আশা করছেন এই আয়োজন আবেগপূর্ণ উত্তেজনা কমানোর একটি উপায় হতে পারে।
যুদ্ধ বন্ধের কোনো লক্ষণ না থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় পুনর্গঠনে বিনিয়োগের সমর্থন আদায় এমনিতেই কঠিন হয়ে পড়েছে। তা সত্ত্বেও ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সিভরিদেঙ্কো জানিয়েছেন, কিয়েভ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে বিশেষ করে জ্বালানি খাত শক্তিশালী করতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই করার পরিকল্পনা করছে। এবারের সম্মেলনে জ্বালানি, যোগাযোগ ও অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রথমবারের মতো ইউক্রেনের নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়েও আলোচনা হবে। সম্মেলনে পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, রোমানিয়া ও সুইডেনের রাষ্ট্রনেতাদের পাশাপাশি ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রধান আন্তোনিও কস্তাও উপস্থিত থাকছেন। রাশিয়ার আগ্রাসন মোকাবিলায় বিপুল ব্যয়ের কারণে ইউক্রেন বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে বাইরের অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেশটিকে ৯০ বিলিয়ন ইউরোর ঋণ অনুমোদন করেছে, যার সিংহভাগ প্রতিরক্ষায় ব্যয় হবে। কিয়েভের সেন্টার ফর ইকোনমিক স্ট্র্যাটেজির পরিচালক গ্লিব ভিশলিনস্কি মনে করেন, পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ছাড়া দেশ রক্ষা করা অসম্ভব, কারণ সামরিক বাহিনীকে সমর্থন দেওয়া করদাতাদের জন্য জরুরি সেবা ও আবাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।






















