যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের চার সদস্য। এই হত্যাকাণ্ডের পর ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধ শেষে নিজেদের দৃঢ় অবস্থান এবং জাতীয় ঐক্য তুলে ধরতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে ইরান কর্তৃপক্ষ। এরই অংশ হিসেবে সোমবার তেহরানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তার শেষযাত্রা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা স্থানীয় সময় সকাল ৬টা থেকে শুরু হয়ে প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা ধরে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করবে। এর আগে দুই দিন ধরে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ রাখা হয়, যেখানে হাজারো মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানান। ১৯৮৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজায় প্রায় ১ কোটি মানুষের উপস্থিতিতে হুড়োহুড়ি ও পদদলিত হয়ে ১০ জনের মৃত্যু, ১০ সহস্রাধিক আহত হওয়া এবং কাফনের কাপড় ছিঁড়ে মরদেহ মাটিতে পড়ে যাওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঐতিহাসিক বিশৃঙ্খলার পুনরাবৃত্তি এড়াতে এবার মরদেহের কফিন ও জনতার মাঝখানে বিশাল কংক্রিটের দেয়াল দিয়ে বিশেষ সতর্কতামূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এবং রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে জানা গেছে, সোমবারের শেষযাত্রার পর খামেনির মরদেহ মঙ্গলবার ধর্মীয় নগরী কোমে এবং বুধবার ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় নিয়ে যাওয়া হবে। সর্বশেষে আগামী বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের নিজ শহর মাশহাদে তাকে দাফন করা হবে। রোববার মোসাল্লার অনুষ্ঠানে আলী খামেনির তিন ছেলে বিরলভাবে জনসমক্ষে উপস্থিত হলেও, তার আরেক ছেলে মোজতবা খামেনি অনুপস্থিত ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পরপরই মোজতবাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হলেও কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, তিনি ওই বিমান হামলায় আহত হওয়ায় এখনো জনসমক্ষে আসেননি এবং তার আঘাত কতটা গুরুতর তা স্পষ্ট নয়। তবে অনুষ্ঠানে আইআরজিসির নতুন কমান্ডার আহমাদ বাহিদি এবং কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানিকে বিরলভাবে খোলা জায়গায় জনসমক্ষে দেখা গেছে। এছাড়া ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইরানি কর্তৃপক্ষ ঐক্যের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করলেও খামেনির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকায় বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের জীবিত কোনো পূর্বসূরিকে এসব অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি।
দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলবিরোধী হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসা খামেনির শেষকৃত্যে এই দুই সংগঠনের প্রতিনিধি দলও অংশ নিয়েছে। গত জানুয়ারিতে কঠোরভাবে দমন করা সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর, এই বিশাল জনসমাগমকে সরকারের প্রতি জনসমর্থন প্রমাণের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রাথমিক সমঝোতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আপাতত স্থগিত থাকলেও, উভয় পক্ষই প্রয়োজনে পুনরায় সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি রাখায় শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানগুলোতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘প্রতিশোধের দাবি’ তীব্র হয়ে উঠেছে। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ৩৮ বছর বয়সী মিরেমাদি এবং ৩৯ বছর বয়সী নারী বাকান্দ এএফপিকে জানান, তারা বিপ্লব ও নেতার পাশে আছেন এবং খামেনির হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করে এই রক্তের প্রতিশোধ চান।













