প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে ব্যবসায়িক লেনদেনের নিরাপত্তা হিসেবে জমা দেওয়া ব্যাংকের চেক ব্যবহার করে একের পর এক মামলা দায়ের, ব্যবসায়ীদের হয়রানি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার মেঘনাঘাট এলাকায় অবস্থিত আল মোস্তফা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের আর্থিক হিসাব নিষ্পত্তি না করে সিকিউরিটি চেক দিয়ে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। এমনকি এসব মামলাকে কেন্দ্র করে একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার সহায়তায় ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি ও ডিবি পুলিশ দিয়ে হয়রানির অভিযোগও তুলেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা।
ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ, মো. মোস্তফা কামাল আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। এলাকার প্রভাবশালী নেতা হিসেবে ভুমি দখল থেকে শুরু করে এমন কোনো খারাপ কাজ নেই যে তিনি করেননি। ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কার্যত আল মোস্তফা গ্রুপের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পাওনা ও দেনার হিসাব নিষ্পত্তির পরিবর্তে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনা বাড়তে থাকে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীরা এসব ঘটনাকে পরিকল্পিত ‘মামলা বাণিজ্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
হক গ্রুপের বিরুদ্ধে ২৯টি মামলা, সমঝোতার উদ্যোগেও সাড়া না দেওয়ার অভিযোগ
দেশের অন্যতম পুরোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান হক গ্রুপের সঙ্গে আল মোস্তফা গ্রুপের প্রায় ১৪ বছরের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। হক গ্রুপ তাদের বিস্কুটের প্যাকেজিং সামগ্রী আল মোস্তফা গ্রুপের কাছ থেকে সংগ্রহ করত।
হক গ্রুপের চিফ অপারেটিং অফিসার জাহিদুল ইসলাম বিদ্যুতের দাবি, দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকের চেক নিরাপত্তা জামানত হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর আল মোস্তফা গ্রুপ মালামাল সরবরাহ বন্ধ করে দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে হিসাব নিষ্পত্তির প্রয়োজন দেখা দেয়।
হক গ্রুপের পক্ষ থেকে বারবার আলোচনার মাধ্যমে দেনা-পাওনা সমন্বয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলেও আল মোস্তফা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তার প্রতিনিধিরা আলোচনায় বসেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দাবি, সমঝোতার পরিবর্তে সিকিউরিটি চেক ব্যবহার করে হক গ্রুপের বিরুদ্ধে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (এনআই) অ্যাক্টের আওতায় এ পর্যন্ত ২৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই ব্যবসায়িক বিরোধকে কেন্দ্র করে থানায়ও পৃথক মামলা করা হয়েছে বলে তিনি জানান। মোট মামলা দিয়েছে ২৯টি। যেখানে হাইকোর্ট একটি রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, এনআই অ্যাক্টে মামলা মানে কাউকে হয়রানির জন্য নয়। বরং টাকা আদায় করা যায় কিভাবে তার উপায় বের করা। বিবাদী যদি বাদীর পাওনা দিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় তাহলে তাকে কোনোভাবে হয়রানি বা গ্রেফতার করা যাবে না। অথচ আল মোস্তফা গ্রুপের পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য বারবার বসার কথা বলা হলেও তা না শুনে বরং একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে মনে করেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা।
হক গ্রুপের জনসংযোগ কর্মকর্তা সাকিব হাসান বলেন, আল মোস্তফা গ্রুপের সাথে হক গ্রুপের ব্যবসায়ীক লেনদেন ১৪ বছরের। এরমধ্যে মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ১১৪ কোটি টাকার মতো। যার ১১২ কোটি ৪৫ লাখ টাকার মতো পরিশোধ করা হয়েছে। হিসেব অনুযায়ী তারা টাকা পাবে এক কোটি ৫৫ লাখের মতো। আল মোস্তফা গ্রুপের দাবি অনুযায়ী টাকা পাবে ৫ কোটির বেশি। কিন্তু মামলা দিয়েছে এখন পর্যন্ত ১১ কোটি পাওনার দাবি করে।
তিনি আরও বলেন, যেসব চেকের আংশিক টাকা পরিশোধ করা হয়েছে সেগুলোর বিপরীতেও মামলা দিয়েছে। এমনকি একই চেক ও ভাউচার দিয়েও আলাদা আলাদা মামলা দিয়েছে। বার বার বসার তাগিদ দিলেও বসতে রাজি না মোস্তফা কামাল। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, শুধু হক গ্রুপই নয় বরং অন্যান্য ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে এরকম মামলা দিচ্ছেন। কারন তিনি মুলত জুলাই মামলার হাত থেকে বাঁচতেই বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানির অপতৎপরতা করছেন। টাকা আদায়ই যদি মুল উদ্দেশ্য হতো তাহলে তিনি বসতেন এভাবে একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করতেন না।
অভিযোগকারীদের দাবি, শুধু হক গ্রুপ নয়, এলিন ফুডসহ আরও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে একই ধরনের মামলা করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, যশোর, নওগাঁ, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় এসব মামলা দায়েরের অভিযোগ রয়েছে।
গভীর রাতে ডিবি পুলিশের অভিযান, ডিএমপি কমিশনারের কাছে অভিযোগ
ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে হয়রানির অভিযোগও সামনে এসেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে দেওয়া একটি লিখিত অভিযোগের বরাতে জানা যায়, গভীর রাতে একটি স্বনামধন্য খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হক গ্রুপের চিফ অপারেটিং অফিসারের বাসায় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল অভিযান চালায়।
অভিযোগে দাবি করা হয়, ওই কর্মকর্তাকে বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাকে ডিবি কার্যালয়ে গ্রেফতার দেখানোর পরিবর্তে একটি থানার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
লিখিত অভিযোগে অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা, অভিযানের অনুমোদন, আইনগত এখতিয়ার এবং গ্রেফতার প্রক্রিয়ার যথার্থতা তদন্তের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বন্ধ প্রতিষ্ঠানে অবসরপ্রাপ্ত এএসপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আল মোস্তফা গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে একজন অবসরপ্রাপ্ত সহকারী পুলিশ সুপারের (এএসপি) সংশ্লিষ্টতা।
অভিযোগকারী ব্যবসায়ীদের দাবি, ওই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ব্যবসায়িক বিরোধ ও মামলা পরিচালনাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে ভূমিকা পালন করছেন। তাদের অভিযোগ, তার পূর্ববর্তী পেশাগত পরিচয় ও যোগাযোগকে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকার পরও একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা এবং তার দায়িত্বের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
নদী-খাল ও সরকারি জমি দখলের অভিযোগ আল মোস্তফা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে ব্যবসায়িক বিরোধের বাইরেও জমি দখল ও পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার মেঘনাঘাট এলাকায় নদী, সরকারি খাসজমি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জমি বালু ভরাটের মাধ্যমে দখলের অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
অবৈধ গ্যাস সংযোগ ব্যবহারের অভিযোগ
আল মোস্তফা গ্রুপের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অবৈধ ও অননুমোদিত গ্যাস সংযোগ ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সোনারগাঁও শিল্প এলাকায় অনুমোদনবিহীন গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে কারখানা পরিচালনার ঘটনা ঘটেছে। যা বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, এসব মামলাকে কেন্দ্র করে অর্থ আদায়ের চাপ দেওয়া হচ্ছে। তারা বিষয়টিকে ‘মামলা বাণিজ্য’ ও চাঁদাবাজির প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মেঘনা গ্রুপের মোস্তফা কামালের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই এদিকে নামের মিলের কারণে বিভ্রান্তি এড়াতে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আল মোস্তফা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তফা কামাল এবং মেঘনা গ্রুপের একই নামের ব্যক্তি এক নন। দুটি প্রতিষ্ঠান পৃথক এবং তাদের ব্যবস্থাপনা, মালিকানা ও ব্যবসায়িক পরিচয়ও আলাদা বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে। ফলে আল মোস্তফা গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে মেঘনা গ্রুপ বা তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তির দাবি হক গ্রুপসহ অভিযোগকারী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, ব্যবসায়িক লেনদেনের প্রকৃত হিসাব নির্ধারণ করে আইনসম্মত উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হোক।
একই সঙ্গে সিকিউরিটি চেকের ব্যবহার, একাধিক মামলা দায়েরের প্রেক্ষাপট, পুলিশের অভিযানের আইনগত ভিত্তি এবং অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার কথিত ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
পারফেক্ট প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের সঙ্গে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ব্যবসায়িক লেনদেনের পর ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার ১৬টি চেক নিয়ে মামলা দায়েরের অভিযোগ উঠেছে আল মোস্তফা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং কোম্পানির বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের ভিত্তিতে সরল বিশ্বাসে আল মোস্তফাকে ১৬টি চেক দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে হঠাৎ পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে ওই চেকগুলোর বিপরীতে ১৬টি মামলা দায়ের করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি,পাওনা টাকা পরিশোধ ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আল মোস্তফা কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার আলোচনায় বসার আহ্বান জানানো হয়েছে। এমনকি প্রকৃত পাওনা পরিশোধের আশ্বাস দিয়ে মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধও করা হয়। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, আল মোস্তফা কর্তৃপক্ষ কোনো আলোচনায় বসতে রাজি হয়নি।
ফলে গত তিন বছর ধরে একের পর এক মামলার কারণে আদালতে দৌড়াদৌড়ি ও আইনি হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের দাবি, আলোচনার মাধ্যমে পাওনা নিষ্পত্তির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মামলা চালিয়ে যাওয়ায় আল মোস্তফার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের মতে, ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার সবার রয়েছে। তবে সেই প্রক্রিয়া যেন কাউকে অযৌক্তিকভাবে হয়রানি বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে আল মোস্তফা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তফা কামালকে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে এসব বিষযে জানতে চাইলে শনিবার (১৭ অক্টোবর) পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত এএসপি এএসএম আজাদ বলেন, আমি আল মোস্তফা গ্রুপে চাকরি করি। সুতরাং সবকিছুর দেখভালের দায়িত্ব আমার। টাকা আদায়ের পরিবর্তে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দিচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাওনা আদায়ের জন্য তো মামলা দিবোই। টাকা দিয়ে যাক মামলা হবে না।
ডিবি পুলিশ দিয়ে অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, হ্যা আমি ডিবি পুলিশ দিয়ে অভিযান চালিয়েছি আরও চালাবো। আপনি যা লেখার লিখে দেন বলেও জানান অবসরপ্রাপ্ত এএসপি এএসএম আজাদ।























