ময়মনসিংহ শিক্ষা ও সংস্কৃতির চারণভূমি হিসেবে পরিচিত ময়মনসিংহ জেলা এখন মাদকের করাল গ্রাসে জর্জরিত। জেলার ভারত সীমান্তবর্তী বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অবাধে প্রবেশ করছে হরেক রকমের মাদকদ্রব্য। স্থানীয়দের ভাষায়, মাদক এখন যেন ‘ফেরিওয়ালার বাদাম’, হাত বাড়ালেই মিলছে সহজে। এর ফলে একদিকে যেমন সক্রিয় হয়ে উঠেছে মাদক কারবারিরা, অন্যদিকে মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে কিশোর-তরুণ থেকে শুরু করে বয়স্করা। জেলাজুড়ে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই, খুন ও ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধ।
সীমান্ত গলে মাদক মাঝ-জেলায়: প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসনের ভূমিকা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন দেশে ঢুকছে গাঁজা, ইয়াবা, ইস্কফ সিরাপ, মদ ও ফেনসিডিলের মতো ভয়ানক সব মাদক। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব মাদক ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
স্থানীয়দের মনে বড় প্রশ্ন— সীমান্ত পার হয়ে কীভাবে এসব মাদক দেশের ভেতরে চলে আসছে? বিজিবি ও স্থানীয় পুলিশ সীমান্তে কী ভূমিকা রাখছে? কয়েকদিন পর পর জেলার মধ্যঅঞ্চলে বা বিভিন্ন থানায় যখন ভারতীয় মদ ও মাদক উদ্ধার হয়, তখন সীমান্ত পাহারার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, বিজিবি ও পুলিশ যদি সত্যিই তৎপর হয়, তবে মাদকের চোরাচালান একদিনেই বন্ধ করা সম্ভব।
আতঙ্কে অভিভাবকরা, জিম্মি সাধারণ মানুষ
হালুয়াঘাট বাজারের বাসিন্দা সেলিম মিয়া জানান:
“এই উপজেলায় সকাল-সন্ধ্যায় বড় বড় গাড়ি নিয়ে মাদক কারবারিরা আসে এবং গাড়ি ভর্তি করে মাদক নিয়ে চলে যায়।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আতঙ্কিত অভিভাবক বলেন, “হালুয়াঘাটে মাদক যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে আমরা সন্তানদের নিয়ে চরম আতঙ্কে আছি। মাদকের টাকা জোগাড় করতে সন্তানরা মা-বাবার গায়ে হাত তুলছে, এমনকি খুনের ঘটনাও ঘটছে।”
অন্যদিকে, ধোবাউড়া উপজেলার রিকশাচালক সোলেমান হোসেনের কণ্ঠে ফুটে উঠল এক নির্মম সত্য:
“চোখের সামনে সবই দেখি। কিন্তু প্রতিবাদ করলেই হামলা ও হুমকি আসে। অনেক পরিবার সরাসরি এই চোরাচালানে জড়িত, তাদের বাসায় হানা দিলেই মাদক মিলবে।”
শহরের পরিত্যক্ত ভবনগুলো এখন মাদকসেবীদের নিরাপদ আস্তানা। সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে ঢুকলেই সিরিঞ্জ ও বোতল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। চোখের সামনে একটি প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, অথচ প্রশাসন নীরব। মাদকাসক্তদের সুস্থ জীবনে ফেরাতে কাউন্সিলিং এবং যুবকদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা জরুরি।”
পরিসংখ্যান: মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযান ও জব্দ তালিকা
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পরেও থামানো যাচ্ছে না এই চোরাচালান। গত দুই বছরের অভিযানের একটি চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
কী বলছে কর্তৃপক্ষ?
ময়মনসিংহ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন:
“বাংলাদেশে কোনো মাদক উৎপাদন হয় না। সব মাদকই ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে আসে। আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছি এবং ব্যবসায়ী ও মাদক জব্দ করছি। তবে কেবল অভিযানেই এটি নির্মূল সম্ভব নয়; শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সমাজের সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং মাদককে ‘না’ বলতে হবে।”
অন্যদিকে, সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের (৩৯ বিজিবি) অধিনায়ক লে কর্নেল মো. নুরুল আজিম বায়েজীদ জানান:
“সীমান্ত দিয়ে মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে বিজিবি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে। চোরাচালান রোধে সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং নিয়মিত মাদক ও কারবারিদের আটক করা হচ্ছে।”
ময়মনসিংহবাসীর প্রত্যাশা
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি যেন শুধু মুখের কথায় বা কেবল মাদক জব্দের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ না থাকে। মূল চোরাচালান চক্র এবং পর্দার আড়ালের গডফাদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হোক— এমনটাই এখন ময়মনসিংহবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।




















