ঢাকাই চলচ্চিত্রের কালজয়ী চিত্রনায়ক সালমান শাহর (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তার মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে লাশ উত্তোলন করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও নতুন করে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করারও আদেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা গত ২৪ মে এই আদেশ দেন। এর আগে ২০ মে সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জিয়াউল মোর্শেদ আদালতে এই আবেদনটি করেছিলেন।
আজ বিষয়টি নিশ্চিত করে তদন্তকারী কর্মকর্তা জিয়াউল মোর্শেদ বাসস-কে বলেন,
“হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য আমরা লাশ কবর থেকে উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি এবং ময়নাতদন্তের অনুমতির আবেদন করেছিলাম। আদালত তা মঞ্জুর করেছেন। কিছু আইনি ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষ করে আমরা দ্রুতই সিলেটে হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার প্রাঙ্গণ থেকে লাশ উত্তোলন করে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করব।”
অপমৃত্যু থেকে হত্যা মামলা: পেছনের ঘটনা
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যুর পর রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তবে সালমানের পরিবার শুরু থেকেই একে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছে। ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই সালমানের বাবা মৃত কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী আদালতে একটি দরখাস্ত দিয়ে অপমৃত্যু মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর এবং সিআইডি তদন্তের আবেদন জানিয়েছিলেন।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদী পক্ষের রিভিশন মঞ্জুর করে এটিকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। আদালতের এই আদেশের পর, গত বছরের ২১ অক্টোবর সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর বাদী হয়ে রাজধানীর রমনা থানায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। বোনের (সালমানের মা নীলা চৌধুরী) পক্ষ থেকে এখন তিনি এই মামলাটি পরিচালনা করছেন।
এজাহারে যা বলা হয়েছে
মামলার এজাহারে বাদী মোহাম্মদ আলমগীর উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সালমানের মা নীলা চৌধুরী, বাবা কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং ছোট ভাই শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার বাসায় সালমানের সাথে দেখা করতে যান। তখন সালমানের স্ত্রী সামীরা হক এবং কর্মচারী আবুল জানান যে সালমান ঘুমাচ্ছেন। এরপর তারা গ্রিন রোডের বাসায় ফিরে আসার পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফোন আসে যে সালমানের কিছু একটা হয়েছে।
তারা দ্রুত ইস্কাটনের বাসায় গিয়ে সালমান শাহকে শয়নকক্ষের খাটের ওপর নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। সে সময় কয়েকজন বহিরাগত নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন এবং পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসে ছিলেন। সালমানকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখা যায়। প্রথমে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সালমান শাহকে মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্ত শেষে সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার প্রাঙ্গণে তাকে দাফন করা হয়।
সামীরা ও আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ আসামি ১১ জন
দায়েরকৃত এই হত্যা মামলায় অজ্ঞাতনামা বেশ কয়েকজন ছাড়াও ১১ জনকে সুনির্দিষ্টভাবে আসামি করা হয়েছে। আসামিরা হলেন:
১. সামীরা হক (সালমান শাহর স্ত্রী)
২. আজিজ মোহাম্মদ ভাই (শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক)
৩. লতিফা হক লুছি
৪. ডন (চলচ্চিত্রের খলনায়ক)
৫. ডেবিট
৬. জাভেদ
৭. ফারুক
৮. রুবি (মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের কর্মী)
৯. আব্দুস সাত্তার
১০. সাজু
১১. রেজভি আহমেদ ফরহাদ (১৭)
এজহারে উল্লেখ করা হয়েছে, এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাতনামা পলাতক আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগসাজশে সালমান শাহকে হত্যা করেছেন। তবে আইনি নিয়ম অনুযায়ী, মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করে থাকলে প্রমাণ সাপেক্ষে তারা এই মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পাবেন। সিআইডির নতুন এই তদন্ত এবং পুনঃময়নাতদন্তের মাধ্যমে সালমান শাহর মৃত্যুর দীর্ঘদিনের রহস্য উদঘাটিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।




















