মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়া এবং এর জেরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) নীতিনির্ধারকেরা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। চলতি সপ্তাহে তারা সুদের হার পুনর্নির্ধারণ করবেন কি না, তা নিয়ে জোরালো আলোচনা চলছে। এর আগে, সংঘাতের কারণে ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়ায় গত জুনে ইসিবি ২০২৩ সালের পর প্রথমবারের মতো ঋণের সুদের হার বাড়িয়েছিল। পরবর্তীতে ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতায় পৌঁছালে মূল্যস্ফীতি আবার ইসিবির দুই শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার দিকে নামতে শুরু করে। ফলে, আগামী বৃহস্পতিবারের বৈঠকে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখাই প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই দুই পক্ষের মধ্যে আবারও সংঘর্ষ শুরু হওয়া এবং ইরান গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে।
চলতি পরিস্থিতির মধ্যেও অধিকাংশ বিশ্লেষকের ধারণা, নীতিনির্ধারকেরা এবারও মূল সুদের হার ২ দশমিক ২৫ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখবেন। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বেরেনবার্গ ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ফেলিক্স শ্মিড্ট জানান, এই বৈঠকে সুদের হারে কোনো পরিবর্তনের প্রত্যাশা তারা করছেন না। তার মতে, তেলের দাম এখনো আশঙ্কাজনক পর্যায়ে বাড়েনি এবং ইউরোজোনে এর বড় ধরনের প্রভাব বা মূল্যস্ফীতির চাপ অন্য পণ্য ও সেবায় ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যায়নি। অন্যদিকে, আইএনজির অর্থনীতিবিদ কার্স্টেন ব্রজেস্কি মনে করেন, ইসিবি সুদের হার বাড়াতে পারে এমন সামান্য সম্ভাবনা থাকলেও হার অপরিবর্তিত রাখাই এখনো সবচেয়ে সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত। তবে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি ইসিবির সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে থাকা ‘হকস’ এবং নমনীয় নীতির পক্ষে থাকা ‘ডাভস’-দের মধ্যে একটি উত্তপ্ত বিতর্কের জন্ম দিতে পারে, যা গ্রীষ্মকালীন বিরতির আগে তাদের শেষ বড় বিতর্ক হতে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসিবি-ই ছিল সুদের হার বাড়ানো প্রথম বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর কয়েক দিন পর জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ৩১ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সুদের হার বাড়ায়; তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদের হার বাড়ায়নি। এই দুই ব্যাংকসহ ব্যাংক অব জাপানের পরবর্তী বৈঠক জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। চলতি সপ্তাহে ইসিবির সুদের হার বাড়াতে অনীহার পেছনে জুনের সিদ্ধান্তের সমালোচনাও একটি বড় কারণ। কিছু অর্থনীতিবিদের মতে, ওই সময় সুদের হার বাড়ানোর ফলে এমনিতেই চাপে থাকা ইউরোজোনের পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া, এ সপ্তাহের বৈঠকে নীতিনির্ধারণে সহায়তার জন্য ইসিবির হাতে নতুন কোনো অর্থনৈতিক পূর্বাভাসও থাকবে না, কারণ সর্বশেষ পূর্বাভাসটি গত জুনেই প্রকাশ করা হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে সুদের হার ঘোষণার পর সংবাদ সম্মেলনে ইসিবি সভাপতি ক্রিস্টিন লাগার্দের বক্তব্যের দিকে গভীর নজর থাকবে বিনিয়োগকারীদের। ভবিষ্যতে সুদের হার কোন পথে যেতে পারে, সে বিষয়ে তিনি কোনো ইঙ্গিত দেন কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়; যদিও এ ধরনের বিষয়ে লাগার্দ সাধারণত খুবই সংযত থাকেন। এর পাশাপাশি, আগামী বছর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘ইউরোপের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে ভূমিকা রাখতে ইসিবির প্রধানের পদ ছাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি বলে চলতি মাসে এক সাক্ষাৎকারে জানান লাগার্দ। ফলে সংবাদ সম্মেলনে তার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে তাকে। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, গ্রীষ্মকালীন বিরতির পর সেপ্টেম্বরে ইসিবি আবারও সুদের হার বাড়াতে পারে, তবে পরিস্থিতি এখনো বেশ অনিশ্চিত। বেরেনবার্গের অর্থনীতিবিদ ফেলিক্স শ্মিড্টের ভাষায়, “আট সপ্তাহে অনেক কিছুই ঘটতে পারে।”





















