রাজধানীর চিরচেনা জলাবদ্ধতা সমস্যা স্থায়ীভাবে নিরসনে দখল হওয়া খাল উদ্ধার, পরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণ এবং নর্দমা ও বক্স কালভার্ট থেকে পলিথিন ও বর্জ্য অপসারণে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। এই সংকট মোকাবিলায় ইতোমধ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ভারী বৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো থেকে পোর্টেবল পাম্প এবং বিদ্যমান পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে দ্রুত পানি অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকার জমে থাকা বৃষ্টির পানি যাতে দ্রুত আশপাশের নদীগুলোতে নিষ্কাশন করা যায়, সে লক্ষ্যে দুই সিটি করপোরেশনই সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় কমলাপুর টিটিপাড়া, ধোলাইখাল ও হাতিরঝিলে তিনটি আউটলেট রয়েছে, যা দিয়ে ১০৯.২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার পানি নিষ্কাশন হয়। এই ধারণক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য আরও দুটি নতুন আউটলেট নির্মাণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘মেট্রো ঢাকা রেজিলিয়েন্স প্রকল্প’-এর আওতায় গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত একটি বৃহৎ নর্দমা (আউটলেট) এবং শ্যামপুর খালের পানি বুড়িগঙ্গা নদীতে নিষ্কাশনের জন্য বক্স কালভার্ট ও আট ফুট ব্যাসের বৃহৎ নর্দমা নির্মাণের কাজ চলছে। অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) তাদের আওতাধীন ২৯টি খাল দখলমুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে এবং খালের ভাসমান বর্জ্য ও স্লাজ অপসারণের কাজ অব্যাহত রেখেছে। দ্রুত পানি অপসারণের জন্য ডিএনসিসির হটস্পটগুলোতে সাড়ে তিনশর বেশি কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন।
বর্তমানে ডিএসসিসির নিউমার্কেট, নাইম রোড, গ্রিন রোড, শান্তিনগর, মালিবাগসহ প্রায় ৩৩টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ২২টি খালের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে পরিষ্কার ও পুনঃখনন কাজ চলছে। পাশাপাশি চারটি বক্স কালভার্ট ও ওয়ার্ডভিত্তিক নর্দমা পরিষ্কারের উদ্যোগসহ ছয়টি পোর্টেবল পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে কালুনগর, শ্যামপুর, জিরানী ও মান্ডা এলাকায় চারটি বৃহৎ খাল খননসহ টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে উন্নয়ন কাজের ক্ষেত্রে ড্রেনেজ লাইনের ভেতর পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট ও টেলিফোনের লাইন থাকায় পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানিয়েছে ডিএসসিসি। এর পাশাপাশি ডিএনসিসিও তাদের প্রকল্পের আওতায় আউটলেট ও নর্দমা নির্মাণ, সবুজ এলাকা বৃদ্ধি, পাম্প স্টেশনের সক্ষমতা বাড়ানো এবং জনসচেতনতা ও আইন প্রয়োগের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়নই ঢাকার জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। বুয়েটের আইডব্লিউএফএম-এর অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. সাইফুল ইসলাম, ক্যাপস-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার এবং বাপা-এর সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির জানান যে— খাল ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যে ড্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই মূলত সামান্য বৃষ্টিতেই তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এই সমস্যা সমাধানে ঢাকার চারপাশের নদীগুলো খনন করা, বর্ষার আগে ড্রেন ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কার করা, আবর্জনা ডাম্পিং এবং দুই সিটি করপোরেশনের সমন্বিত ও বলিষ্ঠ ভূমিকা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। উল্লেখ্য, ধানমন্ডি-২৭, গ্রিন রোড, নিউমার্কেট, মালিবাগ, মগবাজার, কাওরান বাজার, ফার্মগেট, মিরপুর, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়াসহ নগরীর বেশ কিছু এলাকাকে ঢাকার জলাবদ্ধতার প্রধান হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা সংস্কারে এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।













