দীর্ঘ আট মাসেরও বেশি সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করা এবং বিভাগীয় তদন্তে ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়ন’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস ক্যাডারের প্রথম সচিব (অতিরিক্ত কমিশনার) তানজিনা রইসকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সরকার। মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে ১৫ জুলাই (বুধবার) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) ভারপ্রাপ্ত সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই আদেশ জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
প্রজ্ঞাপনের বিবরণ অনুযায়ী, তানজিনা রইস ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর এক মাসের ছুটি নিয়ে প্রথমে থাইল্যান্ড ও পরে অস্ট্রেলিয়া যান। তবে ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি আর কর্মস্থলে যোগদান করেননি। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি ই-মেইলের মাধ্যমে আরও তিন মাসের ছুটির আবেদন করলেও সেটি সরকারি বিধি অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়ায় দাখিল করা হয়নি। এরপর ২০২৫ সালের ৪ মার্চ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে তাকে অবিলম্বে কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি তা অমান্য করেন। অনুমতি ছাড়া এভাবে দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-২০১৮ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ৯ জুলাই তানজিনা রইসকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু করে সরকার। এ সময় বিভাগীয় মামলায় তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়ন’-এর অভিযোগ এনে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি কোনো লিখিত জবাব দেননি। এরপর একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত পরিচালনা করা হয়। দীর্ঘ এক বছরব্যাপী গভীর অনুসন্ধান ও আনুষঙ্গিক নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে তানজিনা রইসের বিরুদ্ধে আনা উভয় অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে বলে মত দেওয়া হয়।
সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামত পর্যালোচনার পর বিষয়টি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপতির সদয় অনুমোদনক্রমে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৪(১)(খ) বিধি অনুযায়ী তানজিনা রইসকে চাকরি থেকে বরখাস্তের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা রক্ষায় বিধিমালা অনুযায়ী সব ধরনের তদন্ত ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে তানজিনা রইসের সহকর্মী ও ব্যাচমেটরা জানিয়েছেন যে, তিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াতেই অবস্থান করছেন এবং সেখানে একটি চাকরিতে নিয়োজিত আছেন। বাংলাদেশে ফিরে এসে পূর্বের পদে যোগদানের ব্যাপারে তাঁর আর কোনো আগ্রহ নেই বলেও তাঁরা মন্তব্য করেন। এই ঘটনাটি নিয়ে বর্তমানে প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বে অনুপস্থিত থাকা একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ নজিরবিহীন না হলেও, এটি দেশের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।













