ঢাকের গম্ভীর আওয়াজ, ঢোলের ছন্দ, কাঁসরের ঝংকার আর সানাইয়ের সুরে মুখর কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট। কেউ ঢাক বাজিয়ে তুলে ধরছেন নিজের দক্ষতা, কেউ বাজনার তালে নাচছেন। আবার কেউ পছন্দের ঢাকি দলকে বায়না করতে ব্যস্ত দরদামে। সব মিলিয়ে বাদ্যের সুর, শিল্পীদের পরিবেশনা আর ক্রেতা -বিক্রেতার দরকষাকষিতে জমে উঠেছে হাট।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল থেকে কটিয়াদী পৌরসভার পুরানবাজার এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স মাঠসংলগ্ন স্থানে বসেছে এ হাট। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাত পর্যন্ত চলবে আয়োজন। দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শত শত ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পী এখানে সমবেত হয়েছেন।
হাটে সাধারণ পণ্যের বেচাকেনা হয় না। শিল্পীদের বাজনা শুনে পছন্দের দল নির্বাচন করেন পূজা আয়োজকেরা। দলের সদস্যসংখ্যা, পরিবেশনার মান, বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয় ও পারিশ্রমিক নিয়ে দরদামের পর চুক্তি চূড়ান্ত হয়।
কটিয়াদী পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবার বিভিন্ন ঢাকি দলের সঙ্গে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা এবং সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকায় বায়না হয়েছে। হাটসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যমতে, দুই শতাধিক ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পী এখানে সমবেত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শতাধিক দল চুক্তিবদ্ধ হয়ে গন্তব্যে রওনা হয়েছে। তবে তখনো অনেক শিল্পী বায়নার আশায় অপেক্ষা করছিলেন।
মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর থেকে আসা ঢাকি পলাশ সরকার, রতন সরকার ও গোপলা সরকারের দলের প্রত্যাশা অন্তত ৮০ হাজার টাকা বায়না পাওয়া। তবে আয়োজকদের সঙ্গে তাঁদের দরদাম হয়েছে ৫৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। দলের সদস্যদের পারিশ্রমিক, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ বিবেচনায় প্রত্যাশিত অর্থ না পেলে চুক্তি চূড়ান্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ভৈরব থেকে দল ভাড়া করতে আসা রেনুকা সরকার বলেন, এবারই প্রথম সরাসরি ঢাকের হাটে এসেছেন তিনি। বিভিন্ন দলের বাজনা শুনে পছন্দের দল নির্বাচনের সুযোগ থাকায় তাঁর কাছে হাটটি বিশেষ আকর্ষণীয়। তবে পছন্দের দলের পারিশ্রমিক নিয়ে কিছুটা অসন্তুষ্টি রয়েছে।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় পাঁচশ বছর আগে চারিপাড়া গ্রামের সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এ হাটের সূচনা। কথিত আছে, বিক্রমপুর অঞ্চল থেকে ঢাকিদের ডেকে এনে তাঁদের বাজনা শুনে পূজার জন্য দল নির্বাচন করা হতো। তবে হাটটির সুনির্দিষ্ট বয়স ও সূচনাকাল নিয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
কটিয়াদী উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি দিলীপ কুমার সাহা বলেন, দুর্গাপূজা সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে উদযাপনে সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, হাটের নিরাপত্তায় পুলিশের মোবাইল টিম কাজ করছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন নজরদারি করছে।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দীন বলেন, প্রায় পাঁচশ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ হাটের পরিবেশ উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিল্পীদের শৌচাগার ও থাকার সমস্যা সমাধানে হাটে শেড নির্মাণের ব্যবস্থাও করা হবে।























