০৯:৫১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকার প্রাচীনত্ব অনুসন্ধান: ৪১৬ বছর বনাম হাজার বছরের ইতিহাস

  • আপডেট সময় : ০৩:০৬:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
  • 55

ঢাকার প্রাচীনত্ব অনুসন্ধান: ৪১৬ বছর বনাম হাজার বছরের ইতিহাস

সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) থেকে ৪১৬ বছর উদযাপনে ‘ঢাকা উৎসব’ ঘোষণার পর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার প্রকৃত বয়স নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ১৬১০ সালে মোগল সুবাদার ইসলাম খান কর্তৃক রাজমহল থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তরের ঘটনাকে ভিত্তি ধরে হিসেব করলে পরাধীন সুবা বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঢাকার বয়স দাঁড়ায় ৪১৬ বছর। তবে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, একটি শহরের বয়স নির্ধারণে মানববসতি, নগরায়ণ, প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং রাজনৈতিক রাজধানীর স্তরগুলোকে আলাদাভাবে দেখতে হয়। ১৬০৮ সালে বাংলার সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ১৬১০ সালে ইসলাম খান ঢাকার নাম ‘জাহাঙ্গীরনগর’ রেখে রাজধানী স্থাপন করার অনেক আগে থেকেই ঢাকা একটি সমৃদ্ধ ও জনবহুল এলাকা ছিল। এমনকি ভূগোলের নিরিখে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু নদ ও টঙ্গী খালবেষ্টিত ঢাকা তার চমৎকার নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সামরিক কৌশলের কারণেই মোগলদের কাছে রাজধানী হিসেবে অগ্রাধিকার পেয়েছিল।

ঢাকার মোগল-পূর্ব ইতিহাস ও নগরায়ণের বড় প্রমাণ পাওয়া যায় ঐতিহাসিক শিলালিপি এবং সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে। পুরান ঢাকার নারিন্দায় অবস্থিত ১৪৫৭ সালের বখত বিনতে (বিনত বিবি) মসজিদ এবং ১৪৫৯ সালের নাসওয়ালাগলির তোরণের শিলালিপি (যা বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত) থেকে স্পষ্ট হয় যে, মোগল আগমনের অন্তত দেড় শতাব্দী আগেই এখানে সুসংগঠিত মুসলিম জনপদ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বিদ্যমান ছিল। শিলালিপিতে বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীন সুলতানি আমলে সুবা বাংলা যে কয়েকটি ‘ইকলিম’ বা বিভাগে বিভক্ত ছিল, তার মধ্যে ‘ইকলিম মোবারকাবাদ’-এর রাজধানী ও প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল আজকের ঢাকা এবং এর শাসক ছিলেন ‘খাজা জাহান’। এছাড়া পুরান ঢাকা ও তার আশেপাশের তাঁতীবাজার, কুমারটুলী, সূত্রাপুরের মতো পেশাভিত্তিক স্থানের নাম এবং শাহ আলী বোগদাদির মাজারসংলগ্ন সুলতানি মসজিদও মোগল-পূর্ব নগরজীবনের প্রমাণ বহন করে।

সম্প্রতি পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত খননে উদ্ধারকৃত বিশাল দুর্গপ্রাচীর, মুদ্রা ও মৃৎপাত্র ঢাকার ইতিহাসকে আরও অতীতে নিয়ে গেছে। কার্বন-১৪ পরীক্ষায় কারাগারের দুর্গটির সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আনুমানিক ১৪৩০ খ্রিষ্টাব্দ, যা মোগলদের ইতিহাসগ্রন্থ বাহারিস্তান-ই-গায়েবি-তে উল্লিখিত পূর্ববিদ্যমান দুর্গের তথ্যের সাথে মিলে যায়। এছাড়া সেখানে প্রাপ্ত গ্লেজড ও রোলেটেড মৃৎপাত্রের সাথে উয়ারী-বটেশ্বর ও মহাস্থানগড়ের নিদর্শনের সামঞ্জস্য থাকায় ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে দ্বিতীয় অব্দের মধ্যেই এখানে নদীকেন্দ্রিক জনপদ গড়ে উঠেছিল। ফলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজের মতে, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে ঢাকার সমৃদ্ধ নগরীর বয়স মোগল আমলের চেয়ে অন্তত ২০০ বছর পিছিয়ে সুলতানি আমলে (প্রায় ৬০০ বছর আগে) যায়, আর জনবসতি হিসেবে এর ইতিহাস হাজার বছরেরও পুরোনো হতে পারে।

ইতিহাসের এমন শক্ত ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও ঢাকা শহরের বয়সকে ৪০০ বা ৪১৬ বছরে সীমাবদ্ধ করার প্রবণতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ২০১০ সালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১৬১০ সালকে ভিত্তি ধরে বিতর্কিতভাবে ঢাকার ৪০০ বছর পূর্তি পালন করা হয়। বর্তমানে ডিএসসিসি প্রশাসক ৪১৬ বছর উদযাপনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে একে ‘ঢাকা পৌরসভা’ গঠনের বর্ষপঞ্জির হিসেব দাবি করলেও তা তথ্যের দিক থেকে সঠিক নয়; কারণ ঐতিহাসিক ও ডিএসসিসির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী ঢাকা পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৬৪ সালের ১ আগস্ট। ইতিহাসবিদদের মতে, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে একটি শহরের বয়স নির্ধারণ না করে পর্যাপ্ত গবেষণা ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রাচীন এই নগরের সঠিক ইতিহাস উদঘাটিত হওয়া প্রয়োজন।

1 October 2026

ঢাকার প্রাচীনত্ব অনুসন্ধান: ৪১৬ বছর বনাম হাজার বছরের ইতিহাস

Spread the love

খেলনা ঘোষণায় আমদানি, কমলাপুরে প্রায় কোটি টাকার ড্রোন জব্দ

ঢাকার প্রাচীনত্ব অনুসন্ধান: ৪১৬ বছর বনাম হাজার বছরের ইতিহাস

আপডেট সময় : ০৩:০৬:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) থেকে ৪১৬ বছর উদযাপনে ‘ঢাকা উৎসব’ ঘোষণার পর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার প্রকৃত বয়স নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ১৬১০ সালে মোগল সুবাদার ইসলাম খান কর্তৃক রাজমহল থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তরের ঘটনাকে ভিত্তি ধরে হিসেব করলে পরাধীন সুবা বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঢাকার বয়স দাঁড়ায় ৪১৬ বছর। তবে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, একটি শহরের বয়স নির্ধারণে মানববসতি, নগরায়ণ, প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং রাজনৈতিক রাজধানীর স্তরগুলোকে আলাদাভাবে দেখতে হয়। ১৬০৮ সালে বাংলার সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ১৬১০ সালে ইসলাম খান ঢাকার নাম ‘জাহাঙ্গীরনগর’ রেখে রাজধানী স্থাপন করার অনেক আগে থেকেই ঢাকা একটি সমৃদ্ধ ও জনবহুল এলাকা ছিল। এমনকি ভূগোলের নিরিখে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু নদ ও টঙ্গী খালবেষ্টিত ঢাকা তার চমৎকার নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সামরিক কৌশলের কারণেই মোগলদের কাছে রাজধানী হিসেবে অগ্রাধিকার পেয়েছিল।

ঢাকার মোগল-পূর্ব ইতিহাস ও নগরায়ণের বড় প্রমাণ পাওয়া যায় ঐতিহাসিক শিলালিপি এবং সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে। পুরান ঢাকার নারিন্দায় অবস্থিত ১৪৫৭ সালের বখত বিনতে (বিনত বিবি) মসজিদ এবং ১৪৫৯ সালের নাসওয়ালাগলির তোরণের শিলালিপি (যা বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত) থেকে স্পষ্ট হয় যে, মোগল আগমনের অন্তত দেড় শতাব্দী আগেই এখানে সুসংগঠিত মুসলিম জনপদ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বিদ্যমান ছিল। শিলালিপিতে বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীন সুলতানি আমলে সুবা বাংলা যে কয়েকটি ‘ইকলিম’ বা বিভাগে বিভক্ত ছিল, তার মধ্যে ‘ইকলিম মোবারকাবাদ’-এর রাজধানী ও প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল আজকের ঢাকা এবং এর শাসক ছিলেন ‘খাজা জাহান’। এছাড়া পুরান ঢাকা ও তার আশেপাশের তাঁতীবাজার, কুমারটুলী, সূত্রাপুরের মতো পেশাভিত্তিক স্থানের নাম এবং শাহ আলী বোগদাদির মাজারসংলগ্ন সুলতানি মসজিদও মোগল-পূর্ব নগরজীবনের প্রমাণ বহন করে।

সম্প্রতি পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত খননে উদ্ধারকৃত বিশাল দুর্গপ্রাচীর, মুদ্রা ও মৃৎপাত্র ঢাকার ইতিহাসকে আরও অতীতে নিয়ে গেছে। কার্বন-১৪ পরীক্ষায় কারাগারের দুর্গটির সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আনুমানিক ১৪৩০ খ্রিষ্টাব্দ, যা মোগলদের ইতিহাসগ্রন্থ বাহারিস্তান-ই-গায়েবি-তে উল্লিখিত পূর্ববিদ্যমান দুর্গের তথ্যের সাথে মিলে যায়। এছাড়া সেখানে প্রাপ্ত গ্লেজড ও রোলেটেড মৃৎপাত্রের সাথে উয়ারী-বটেশ্বর ও মহাস্থানগড়ের নিদর্শনের সামঞ্জস্য থাকায় ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে দ্বিতীয় অব্দের মধ্যেই এখানে নদীকেন্দ্রিক জনপদ গড়ে উঠেছিল। ফলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজের মতে, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে ঢাকার সমৃদ্ধ নগরীর বয়স মোগল আমলের চেয়ে অন্তত ২০০ বছর পিছিয়ে সুলতানি আমলে (প্রায় ৬০০ বছর আগে) যায়, আর জনবসতি হিসেবে এর ইতিহাস হাজার বছরেরও পুরোনো হতে পারে।

ইতিহাসের এমন শক্ত ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও ঢাকা শহরের বয়সকে ৪০০ বা ৪১৬ বছরে সীমাবদ্ধ করার প্রবণতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ২০১০ সালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১৬১০ সালকে ভিত্তি ধরে বিতর্কিতভাবে ঢাকার ৪০০ বছর পূর্তি পালন করা হয়। বর্তমানে ডিএসসিসি প্রশাসক ৪১৬ বছর উদযাপনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে একে ‘ঢাকা পৌরসভা’ গঠনের বর্ষপঞ্জির হিসেব দাবি করলেও তা তথ্যের দিক থেকে সঠিক নয়; কারণ ঐতিহাসিক ও ডিএসসিসির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী ঢাকা পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৬৪ সালের ১ আগস্ট। ইতিহাসবিদদের মতে, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে একটি শহরের বয়স নির্ধারণ না করে পর্যাপ্ত গবেষণা ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রাচীন এই নগরের সঠিক ইতিহাস উদঘাটিত হওয়া প্রয়োজন।

1 October 2026

ঢাকার প্রাচীনত্ব অনুসন্ধান: ৪১৬ বছর বনাম হাজার বছরের ইতিহাস

Spread the love