বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, বাণিজ্য ও কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার লক্ষ্যে বেইজিংয়ে এক ঐতিহাসিক সফরে রয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের অংশ হিসেবে আজ স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা) ঐতিহাসিক গ্রেট হলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন তিনি। বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিষয়ক ১৫টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) মুখপাত্র মাহদী আমিন বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করে আশা প্রকাশ করেন যে, এসব চুক্তি চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বৈঠক শেষে চীনের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর প্রতিনিধিদলের সম্মানে একটি রাষ্ট্রীয় ভোজের আয়োজন করবেন। এছাড়া আগামীকাল স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে) ঐতিহাসিক গ্রেট হলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যেখানে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় ও ইতিবাচক ভূ-রাজনৈতিক আলোচনা স্থান পাবে।
মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, চীনা প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রসার, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক জোরদার করাসহ শিক্ষা, সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে কার্যকর সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা। সফরের অংশ হিসেবে আজ চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী লি গুয়োয়িংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলা, নদী খনন, নদীভাঙন রোধ, সেচ ও নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে উভয় পক্ষ ঐকমত্য পোষণ করে। চীনা মন্ত্রী এই খাতে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে একসাথে কাজ করার গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে আজ সকালে চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (সিসিপিআইটি) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর যৌথ উদ্যোগে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এতে চীনের ৮০টি প্রথম সারির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা ও মালিকরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ উৎপাদন ও শিল্প খাতের নতুন নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হতে পারে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে এবং আনোয়ারা ও মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, চীনে বাংলাদেশের প্রথম ইনভেস্টমেন্ট অফিস স্থাপন ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে বিশেষ প্রণোদনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সাথে ১৫ দিনের কম সময়ে নতুন লাইসেন্স প্রদানের আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী, যার প্রেক্ষিতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের প্রত্যাশা ও পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরে।
সফরের রাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে মুখপাত্র জানান, বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘পার্টি-টু-পার্টি’ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হলে, চীনা পক্ষ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নে পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। এই বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সাথে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। মাহদী আমিন উল্লেখ করেন, ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাতটি ঐতিহাসিক সফরের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই দলীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে মাথায় রেখে সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে এই দ্বিপক্ষীয় সম্পৃক্ততা গভীর করতে চায়।
সফরকালে চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশনসহ চীনের বেশ কয়েকটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ধারাবাহিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা করেন। সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, দীর্ঘদিন পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এবং চীন সফরে যে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাচ্ছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে প্রাধান্য দিয়ে যেভাবে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করছেন, তা বিশ্ব দরবারে দেশের জন্য অত্যন্ত গৌরব ও মর্যাদার। উক্ত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন ও উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি উপস্থিত ছিলেন।





















