চিকিৎসাসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এই সেবাকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে বিপুল সংখ্যক অবৈধ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। জেলা শহর থেকে শুরু করে উপজেলার অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোরই নেই প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা লাইসেন্সের নবায়ন। ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি ও পর্যাপ্ত জনবল ছাড়াই চলছে চিকিৎসাসেবা। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় ৯৬টি বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ৩২টির লাইসেন্স নবায়ন রয়েছে। বাকি ৫১টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়নহীন এবং অন্তত ১৩টি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ নিবন্ধন ছাড়াই বছরের পর বছর পরিচালিত হচ্ছে, যা স্বাস্থ্য খাতের চরম অব্যবস্থাপনা তুলে ধরে।
নির্ধারিত শর্ত উপেক্ষা করে পরিচালিত এসব চিকিৎসাকেন্দ্রে অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্সের তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক জায়গায় অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার ওপর সক্রিয় রয়েছে শক্তিশালী দালালচক্র। রোগীদের ফুসলিয়ে ক্লিনিকে ভর্তি করার পর শুরু হয় অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অতিরিক্ত বিল আদায়ের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল। সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে বা বিলে আপত্তি জানালে রোগী ও স্বজনদের লাঞ্ছিত করার মতো ঘটনাও ঘটছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
অভিযোগ রয়েছে, মাঝে মাঝে লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হলেও কিছুদিন পরই তা রহস্যজনকভাবে পুনরায় চালু হয়ে যায়। সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে নিয়মিত তদারকি না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ১০ শয্যার হাসপাতাল পরিচালনায় এমবিবিএস চিকিৎসক, ডিপ্লোমা চিকিৎসক ও স্টাফ নার্স থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে দালালমুক্ত চিকিৎসার কথা বলা হলেও অনিয়মের দায় তারা এড়াতে পারেন না।
যদিও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করে ক্লিনিক চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ. কে. এম. শাহাব উদ্দীন জানান যে অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে, তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—লাইসেন্সহীন ও নবায়ন ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাচ্ছে? সচেতন নাগরিকদের দাবি, শুধু সাময়িক তালা ঝোলানো নয়, বরং সব ক্লিনিকের নিবন্ধন, জনবল ও অবকাঠামো যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করতে হবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দায়ীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যেন চিকিৎসার নামে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ হয়।






















